বরগুনা জেলা: নদী, সাগর আর জেলেদের জনপদ
বরিশাল বিভাগ · ৫টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
আকাশ ফরসা হওয়ার আগেই পাথরঘাটার মাছঘাট জেগে ওঠে। সাগর থেকে ফেরা ট্রলারের খোল থেকে রুপালি ইলিশ নামে, ঝুড়ি ভরে ওঠে, পাইকারের ডাক আর বরফ ভাঙার শব্দ মিশে যায় নদীর বাতাসে। বরগুনা (Barguna) জেলা বলতে এই ছবিটাই সবার আগে মনে আসে। বাংলাদেশের একেবারে দক্ষিণে, বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে থাকা এই জেলা গড়ে উঠেছে নদীর পলি, সুন্দরবনের পুরোনো জঙ্গল আর জেলেদের পরিশ্রমের ওপর। বরগুনায় জমি যেমন নতুন, মানুষের লড়াইও তেমনি প্রতিদিনের।
বরগুনা নামের পেছনের গল্প
বরগুনার নাম কীভাবে এল, তা নিয়ে কোনো পাকা দলিল নেই। তবে কয়েকটি গল্প মুখে মুখে ঘোরে। সবচেয়ে বেশি শোনা যায় কাঠ ব্যবসায়ীদের কথা। প্রচলিত আছে, উত্তরের বণিকেরা সুন্দরবন থেকে কাঠ নিয়ে ফেরার পথে খরস্রোতা খাকদোন নদী পার হতে এখানে থামতেন। স্রোত অনুকূলে আসার জন্য তাঁদের অপেক্ষা করতে হতো, আর সেই অপেক্ষা বা জোয়ার-ভাটার হিসাবকে স্থানীয় ভাষায় বলা হতো 'বড় গোনা'। সেখান থেকেই নাকি বরগুনা।
আরেকটি ব্যাখ্যা বলে, স্রোতের উল্টো দিকে নৌকা টেনে নিতে গুন বা দড়ি ব্যবহার করতে হতো, আর সেই গুন টানা থেকেই নামের জন্ম। কেউ আবার বলেন, বরগুনা নামে এক প্রভাবশালী রাখাইন বাসিন্দা কিংবা এক বাওয়ালির নাম থেকে জায়গাটির পরিচয় তৈরি হয়েছে। কোনটি সত্যি, তা আজ আর নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে প্রতিটি গল্পেই নদী, নৌকা আর জঙ্গলের কথা আছে, যা এই অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে খাপ খায়।
বন কেটে বসতি থেকে জেলা
একসময় বরগুনার বড় অংশ ছিল সুন্দরবনের অংশ। ধীরে ধীরে মানুষ জঙ্গল সাফ করে আবাদ শুরু করে, কাঠুরে আর বাওয়ালিরা এখানে কাঠ সংগ্রহ করতে আসতেন। আঠারো শতকের শেষ দিকে এখানে থানা গঠিত হয় বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে। ব্রিটিশ আমলে অঞ্চলটি ছিল বাকেরগঞ্জ জেলার অধীনে, পরে পটুয়াখালীর সঙ্গে যুক্ত হয়।
১৯৬৯ সালে বরগুনা মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়। আমতলী, বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, বেতাগী ও বামনা নিয়ে জেলা গঠিত, পরে তালতলী উপজেলাও যোগ হয়েছে।
এই জনপদের ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনার অধ্যায়গুলোর একটি ১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বরগুনা ছিল ৯ নম্বর সেক্টরের আওতায়। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৯৭১ সালের ২৯ ও ৩০ নভেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী বরগুনা সদর কারাগারের ভেতরে শতাধিক মানুষকে হত্যা করে কারাগারের পশ্চিম পাশে গণকবর দেয়। বেতাগী বাজারের একাংশ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বদলিখালি বাজার এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘর্ষে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি লঞ্চ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেলা কারাগারের পাশে ও পাথরঘাটা লঞ্চঘাটে গণকবরের চিহ্ন আজও সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
২০০৭ সালের নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় সিডর বরগুনায় ভয়াবহ ক্ষতি করে গিয়েছিল। উপকূলের বহু গ্রাম তখন লন্ডভন্ড হয়ে যায়। সেই অভিজ্ঞতার পর থেকে এখানে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র আর বাঁধের প্রশ্ন মানুষের জীবনের অংশ হয়ে আছে।
নদীর জাল, সাগরের মোহনা
বরগুনার মানচিত্রে চোখ রাখলে দেখা যায়, জেলাটা যেন নদী দিয়ে কাটা কয়েকটি টুকরো। পায়রা, বিষখালী আর বলেশ্বর এই তিন বড় নদী জেলার ভেতর দিয়ে বা সীমানা ঘেঁষে সাগরে গিয়ে মিশেছে। এর সঙ্গে আছে খাকদোন, আন্ধারমানিক, হরিণঘাটার মতো নদী আর অসংখ্য খাল। জোয়ারে পানি ওঠে, ভাটায় নামে, আর সেই ছন্দেই চলে মানুষের দিন।
কৃষি এখানে প্রধান জীবিকা। ধান আর ডাল প্রধান ফসল, সঙ্গে পান, কলা আর খেজুরের গুড়ও হয়। তবে জেলার পরিচয় তৈরি করেছে মাছ। পাথরঘাটার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রকে দেশের বড় মাছঘাটগুলোর একটি ধরা হয়। ইলিশের মৌসুমে এখানে সাগর থেকে ফেরা ট্রলারের ভিড় লেগে থাকে। চিংড়ি আর সামুদ্রিক মাছও বড় আয়ের উৎস। বড় কলকারখানা তেমন নেই; চালকল, করাতকল আর বরফকলই এখানকার শিল্পের বড় অংশ।
মানুষ, রাখাইন পাড়া আর লোকসংগীত
বরগুনার জনজীবনে বাঙালির পাশাপাশি রাখাইন সম্প্রদায়ের উপস্থিতি এক আলাদা রং যোগ করেছে। জেলার দক্ষিণে, বিশেষ করে তালতলী এলাকায় রাখাইনদের পাড়া আছে। তাঁদের বৌদ্ধ মন্দির, কাঠের বাড়ি, তাঁতের কাপড় আর উৎসবের দিনে ফানুস ওড়ানো দেখতে অনেকে সেখানে যান। বুদ্ধপূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা আর পিঠা উৎসব তাঁদের প্রধান আয়োজন।
লোকসংস্কৃতিতে জারিগান, সারিগান, কবিগান আর কীর্তনের চল ছিল। নদীর দেশ বলে নৌকার গান আর মাঝিদের সুর এখানকার মানুষের পরিচিত। তাঁত, বাঁশ-বেতের কাজ, মৃৎশিল্প আর স্বর্ণকারের কাজও গ্রামীণ জীবনের অংশ।
বরগুনায় কী দেখবেন
বরগুনার দর্শনীয় জায়গাগুলোর বেশির ভাগই প্রকৃতির কাছাকাছি। কয়েকটি জায়গা ভ্রমণকারীদের কাছে বিশেষ পরিচিত:
- টেংরাগিরি বন ও সোনাকাটা সৈকত: তালতলীর এই ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনেরই আত্মীয় বলা যায়। পাশেই সোনাকাটার নিরিবিলি সৈকত আর ইকোপার্ক।
- হরিণঘাটা বন ও লালদিয়ার চর: পাথরঘাটার এই বনে কাঠের পথে হেঁটে গেলে শেষে মেলে লালদিয়ার সৈকত, যেখান থেকে বলেশ্বর আর সাগরের মিলন চোখে পড়ে।
- বিবিচিনি শাহী মসজিদ: বেতাগীর এই এক গম্বুজ মসজিদ মোগল আমলের নিদর্শন হিসেবে পরিচিত, একটি উঁচু ভিটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
- তালতলীর রাখাইন পাড়া ও বৌদ্ধ মন্দির: রাখাইন জীবনযাত্রা আর তাঁতের কাজ কাছ থেকে দেখার জায়গা।
- বিহঙ্গ দ্বীপ ও আশার চর: সাগরের মুখে জেগে ওঠা চর, শীতে পাখি আর শুঁটকি পল্লীর জন্য পরিচিত।
পাতে বরগুনার স্বাদ
বরগুনার রান্নাঘর সাগর আর নদীর ওপর নির্ভর করে। পায়রা আর বিষখালীর ইলিশ এখানে সস্তা নয় ঠিকই, তবে টাটকা। সদ্য ধরা ইলিশ কেটে হলুদ-লবণ মেখে সর্ষের তেলে ভাজা, সঙ্গে গরম ভাত আর ভাজা তেলে একটু কাঁচামরিচ, এই সরল ইলিশ ভাজাই এখানকার মানুষের কাছে আসল ভোজ। ইলিশের মৌসুমে ঘাট থেকে কিনে নিয়ে নদীর পাড়ের হোটেলে ভাজিয়ে খাওয়ার চলও আছে।
শীত এলে চরগুলোতে বাঁশের মাচায় মাছ শুকানো শুরু হয়। লইট্যা, ছুরি, চিংড়ি আর নানা সামুদ্রিক মাছের শুঁটকি এখান থেকে দেশের নানা জায়গায় যায়। বাড়িতে শুঁটকি ভুনা হয় পেঁয়াজ-রসুন আর ঝাল দিয়ে, কখনো বেগুন বা আলুর সঙ্গে। আর আছে কাঁকড়া। নদীর মোহনা আর খালের কাদায় কাঁকড়া ধরা অনেক পরিবারের রোজগার। মসলা দিয়ে কষানো কাঁকড়ার ঝাল বরগুনার অনেক বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের পদ।
এসব খাবারের বিস্তারিত তালিকা, কোথায় পাওয়া যায় আর মানুষের অভিজ্ঞতা জানতে দেখুন বরগুনার বিখ্যাত খাবার।
যাতায়াত ও ভ্রমণের সময়
ঢাকা থেকে বরগুনায় সাধারণত দুইভাবে যাওয়া হয়। সড়কপথে পদ্মা সেতু পার হয়ে বরিশাল হয়ে বাসে সরাসরি জেলা শহরে পৌঁছানো যায়। আবার নদীপথের অভিজ্ঞতা যাঁরা চান, তাঁরা ঢাকার সদরঘাট থেকে রাতের লঞ্চে যান। সকালে নদীর বুকে চোখ মেলে বরগুনার ঘাটে নামা এক আলাদা অভিজ্ঞতা।
ঘোরার সবচেয়ে ভালো সময় শীতকাল, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। তখন সাগর শান্ত থাকে, চরে পাখি আসে আর শুঁটকির মৌসুম চলে। ইলিশ খেতে চাইলে বর্ষার শেষ ভাগ বেছে নিতে পারেন, তবে তখন আবহাওয়ার খবর দেখে বের হওয়া জরুরি।
সাধারণ প্রশ্ন
বরগুনা জেলা কবে গঠিত হয়?
বরগুনা ১৯৬৯ সালে মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
বরগুনার কোন খাবার সবচেয়ে বিখ্যাত?
পায়রা ও বিষখালী নদীর টাটকা ইলিশ ভাজা, চরের শুঁটকি আর মোহনার কাঁকড়া বরগুনার খাবারের প্রধান পরিচয়।
বরগুনায় ম্যানগ্রোভ বন দেখতে কোথায় যাব?
তালতলীর টেংরাগিরি বন ও পাথরঘাটার হরিণঘাটা বন বরগুনার সবচেয়ে পরিচিত ম্যানগ্রোভ এলাকা।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh