বরিশাল জেলা: নদী, কবিতা আর আমড়ার জনপদ
বরিশাল বিভাগ · ১০টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
"আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে" লিখেছিলেন যে কবি, সেই জীবনানন্দ দাশের জন্ম বরিশাল শহরে। তাঁর কবিতায় যে হিজল, কাঁঠালচাঁপা, শঙ্খচিল আর ধানক্ষেতের বাংলা, তার অনেকখানিই বরিশালের মাটি থেকে উঠে আসা। বরিশাল (Barishal) জেলা দক্ষিণবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র, বরিশাল বিভাগের সদর দপ্তরও এখানে। কীর্তনখোলার পাড়ে লঞ্চঘাটের ভোঁ, খালের ভেতর দিয়ে চলা ডিঙি, হাটে স্তূপ করা আমড়া আর পেয়ারা, এসব মিলেই এই জেলার চেনা চেহারা। পুরোনো একটি কথা আছে, "ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল"। কথাটা আজও খুব একটা বদলায়নি।
নামের উৎস: শাল গাছ, লবণ আর এক প্রেমের গল্প
বরিশাল নামের উৎপত্তি নিয়ে অন্তত চারটি ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে। একটি জনশ্রুতি বলে, এখানে একসময় বড় বড় শাল গাছ ছিল, সেই 'বড় শাল' থেকেই বরিশাল। আরেক ব্যাখ্যা লবণের সঙ্গে জড়িত। বলা হয়, গিরদে বন্দরে ঢাকার নবাবদের বড় লবণের গোলা ছিল, আর ইংরেজ ও পর্তুগিজ বণিকেরা এই লবণের চৌকিকে নিজেদের উচ্চারণে এমনভাবে ডাকতেন যে কালক্রমে তা বরিশাল হয়ে যায়। কারও মতে, এখানকার লবণের দানা ছিল বেশ বড়, সেখান থেকেই নামের জন্ম।
চতুর্থ গল্পটা সবচেয়ে রোমান্টিক। প্রচলিত আছে, বেরি নামের এক পর্তুগিজ যুবক আর শেলি নামের এক তরুণীর প্রেমকাহিনি থেকেই জায়গার নাম। তবে এর পক্ষে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, লোকমুখের গল্প হিসেবেই একে দেখা ভালো।
চন্দ্রদ্বীপ, বাকলা আর বাকেরগঞ্জ
বরিশাল অঞ্চলের প্রাচীন নাম চন্দ্রদ্বীপ। প্রাচীন বঙ্গের অংশ এই ভূখণ্ড গড়ে উঠেছে পদ্মা, যমুনা আর মেঘনার আনা পলিতে। মধ্যযুগে চন্দ্রদ্বীপের রাজারা বাংলার সুলতানদের অধীনে থেকেও অনেকটা স্বাধীনভাবে রাজ্য চালাতেন। মোগল আমলে আইন-ই-আকবরীতে অঞ্চলটি বাকলা সরকার নামে উল্লেখিত। ষোড়শ শতকের শেষ দিকে এক প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাসে বাকলার বিপুল প্রাণহানির কথাও আবুল ফজল লিখে গেছেন। পরে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের উৎপাত বাড়লে মোগল সুবাদার শাহ সুজা এ অঞ্চলে দুর্গ নির্মাণ করেন।
ব্রিটিশ আমলে, ১৭৯৭ সালে বাকেরগঞ্জ জেলা গঠিত হয়। নামটি এসেছে প্রভাবশালী জমিদার আগা বাকের খানের নাম থেকে। ১৮০১ সালে জেলার সদর দপ্তর সরিয়ে আনা হয় বর্তমান বরিশাল শহরে, আর ধীরে ধীরে জেলাটিও বরিশাল নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ১৯৯৩ সালে বরিশাল বিভাগ গঠিত হলে এটি বিভাগীয় সদরের মর্যাদা পায়।
উনিশ ও বিশ শতকে বরিশাল ছিল বাংলার রাজনীতি ও শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অশ্বিনীকুমার দত্ত ১৮৮৪ সালে এখানে ব্রজমোহন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্বদেশী আন্দোলনের সময়ও বরিশালের নাম বারবার উঠে এসেছে।
একাত্তরের বরিশাল
মুক্তিযুদ্ধে বরিশাল ছিল ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে, যার কমান্ডার ছিলেন মেজর এম এ জলিল। যুদ্ধের নয় মাসে জেলার নানা জায়গায় গণহত্যা চলে। আগৈলঝাড়ার কোদালধোয়া গ্রামে, বাবুগঞ্জের চাঁদপাশা ইউনিয়নে, বানারীপাড়ায় আর বাকেরগঞ্জে বহু মানুষ প্রাণ হারান বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী বরিশাল ছেড়ে চলে যায়, আর শহরে ওড়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা। দিনটি আজও বরিশাল মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়।
নদী আর খালের জীবন
বরিশালকে অনেকে বাংলার ভেনিস বলেন, আর কারণটা মানচিত্র দেখলেই বোঝা যায়। মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, কীর্তনখোলা, তেঁতুলিয়া, বিষখালী, সন্ধ্যা আর অসংখ্য খাল জেলাটিকে জালের মতো বুনে রেখেছে। শহরটা দাঁড়িয়ে আছে কীর্তনখোলার পাড়ে। একসময় এখানকার মানুষের যাতায়াত প্রায় পুরোটাই ছিল নৌকানির্ভর, এখনো গ্রামে গ্রামে খালই রাস্তা।
উর্বর পলিমাটিতে ধান এখানকার প্রধান ফসল। এক সময় বালাম চালের জন্য বরিশালের নাম ছিল। এর বাইরে পান, সুপারি, নারকেল, আমড়া আর পেয়ারার বাগান অর্থনীতির বড় অংশ। নদীতে ইলিশসহ নানা মাছ ধরা হয়। বিভাগীয় শহর হিসেবে ব্যবসা, চাকরি আর শিক্ষা খাতেও অনেক মানুষের জীবিকা চলে।
বরিশালের মানুষ ও সংস্কৃতি
বরিশালের মাটি অনেক কৃতী মানুষের জন্ম দিয়েছে। জীবনানন্দ দাশের পাশাপাশি কবি সুফিয়া কামালের জন্মও বরিশালে। অশ্বিনীকুমার দত্তের জন্ম গৌরনদীর বাটাজোর গ্রামে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের পৈতৃক বাড়ি বানারীপাড়ার চাখারে, সেখানে তাঁর স্মৃতিতে একটি জাদুঘরও আছে।
লোকসংস্কৃতিতে ভাটিয়ালি, জারি, সারি, মারফতি, মুর্শিদি গান আর পুঁথিপাঠের চল ছিল। যাত্রাপালা আর কবিগানের আসর জমত গ্রামে গ্রামে। বরিশালের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা, যাকে স্থানীয়রা মজা করে 'বরিশাইল্লা' বলেন, দেশজুড়ে পরিচিত। মনসামঙ্গলের কবি বিজয়গুপ্তের নামও এই অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
দেখার মতো জায়গা
বরিশালে ঘুরতে গেলে কয়েকটি জায়গা প্রায় সবার তালিকায় থাকে। বাবুগঞ্জের দুর্গাসাগর দিঘি বিশাল এক জলাধার, মাঝখানে ছোট দ্বীপ, চারপাশে গাছের সারি। প্রচলিত তথ্যমতে চন্দ্রদ্বীপের রাজা শিবনারায়ণের আমলে আঠারো শতকে এটি খনন করা হয়। উজিরপুরের গুঠিয়া মসজিদ বা বাইতুল আমান জামে মসজিদ সাম্প্রতিক সময়ের স্থাপনা হলেও এর সুবিশাল চত্বর, পুকুর আর নকশা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন।
শহরের অক্সফোর্ড মিশন গির্জা লাল ইটের এক শান্ত স্থাপনা, ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্যের সুন্দর নমুনা। উজিরপুরের সাতলার বিলে বর্ষার শেষে লাল শাপলা ফোটে, তখন পুরো বিল যেন রং বদলে ফেলে। আর বর্ষায় বানারীপাড়া ও আশপাশের খালে বসে ভাসমান পেয়ারার হাট, যেখানে নৌকা ভর্তি পেয়ারা বেচাকেনা হয় পানির ওপরেই। চাখারের শেরে বাংলা স্মৃতি জাদুঘরও ঘুরে দেখার মতো।
বরিশালের খাবারের গল্প
বরিশালের খাবার মানেই নদী আর বাগানের ফল। বর্ষা নামলেই হাটে আসে টক-মিষ্টি আমড়া। কাঁচা আমড়া লবণ-মরিচ দিয়ে খাওয়া, আমড়ার আচার, ডালে আমড়া দেওয়া, এসব এখানকার ঘরের চেনা স্বাদ। বরিশালের আমড়া আকারে বড় আর শাঁসালো বলে দেশজুড়ে পরিচিত।
পেয়ারার মৌসুমে খালের পাড়ে পাড়ে সবুজ পেয়ারার স্তূপ চোখে পড়ে। বাগান থেকে সরাসরি নৌকায় তুলে হাটে নেওয়া পেয়ারা কিনে সেখানেই কামড় দেওয়ার মজাই আলাদা। আর ইলিশ? কীর্তনখোলা, মেঘনা আর তেঁতুলিয়ার ইলিশ বরিশালের রান্নাঘরে প্রায় নিত্যদিনের অতিথি। সর্ষের তেলে মচমচে করে ভাজা ইলিশের সঙ্গে ভাজা তেল আর কাঁচামরিচ দিয়ে ভাত মেখে খাওয়া এখানকার মানুষের কাছে খাঁটি আরামের খাবার।
কোথায় কোন খাবার ভালো পাওয়া যায়, মানুষ কী বলছেন, সেসব দেখতে ঘুরে আসুন বরিশালের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাতায়াত ও উপযুক্ত সময়
ঢাকা থেকে বরিশাল যাওয়ার তিনটি পথই চালু আছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিজ্ঞতা সদরঘাট থেকে রাতের লঞ্চে যাত্রা, ভোরে কীর্তনখোলার ঘাটে নামা। পদ্মা সেতু চালুর পর সড়কপথে বাসে যাওয়াও অনেক সহজ হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে বরিশালে আকাশপথেও যাতায়াত করা যায়।
শীতকাল, অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, ঘোরাঘুরির জন্য আরামদায়ক। তবে ভাসমান পেয়ারার হাট আর আমড়ার মৌসুম দেখতে চাইলে বর্ষার মাঝামাঝি থেকে শেষ ভাগ, মোটামুটি জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, সবচেয়ে ভালো সময়।
সাধারণ প্রশ্ন
বরিশালের পুরোনো নাম কী ছিল?
প্রাচীনকালে অঞ্চলটি চন্দ্রদ্বীপ ও মোগল আমলে বাকলা নামে পরিচিত ছিল, আর ব্রিটিশ আমলে ১৭৯৭ সালে গঠিত জেলার নাম ছিল বাকেরগঞ্জ।
বরিশাল কোন খাবারের জন্য বিখ্যাত?
বরিশাল আমড়া, পেয়ারা আর নদীর টাটকা ইলিশের জন্য বিখ্যাত।
ঢাকা থেকে বরিশাল যাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায় কী?
অনেকেই সদরঘাট থেকে রাতের লঞ্চে যান, তবে পদ্মা সেতু হয়ে বাসে এবং আকাশপথেও যাওয়া যায়।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh