Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা: তিতাস, সুর আর ছানামুখী

চট্টগ্রাম বিভাগ · ৯টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. ব্রাহ্মণদের বাড়ি থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া
  2. সমতট থেকে আধুনিক জেলা
  3. আখাউড়া, দরুইন আর একাত্তর
  4. তিতাস, মেঘনা আর গ্যাস
  5. সুরের ঘর: সংগীত আর সাহিত্য
  6. ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যা দেখবেন
  7. মিষ্টির দোকানে এক বিশেষ স্বাদ
  8. যাতায়াত ও ঘোরার সময়
  9. সাধারণ প্রশ্ন

"তিতাস একটি নদীর নাম"। অদ্বৈত মল্লবর্মণের এই উপন্যাস পড়েননি এমন সাহিত্যপ্রেমী বাঙালি কম আছেন। মালো জেলেদের জীবন, তাঁদের উৎসব, প্রেম আর ভাঙনের যে ছবি সেখানে আঁকা, সেই তিতাস নদী বয়ে গেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া (Brahmanbaria) জেলার বুক চিরে। লেখকের জন্মও এই নদীর পাড়ের গোকর্ণ গ্রামে। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে অনেকে বলেন সংস্কৃতির রাজধানী। উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের কিংবদন্তি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ আর ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর জন্ম এই জেলায়। আবার এই মাটির নিচেই আছে দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর একটি, আর মিষ্টির দোকানে মেলে ছানামুখী, যা দেশের আর কোথাও এভাবে তৈরি হয় না।

ব্রাহ্মণদের বাড়ি থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া

জেলার নামকরণ নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাটি ব্রাহ্মণ পরিবারের বসতিকে ঘিরে। এস এম শাহনূরের 'নামকরণের ইতিকথা' গ্রন্থের বরাতে বলা হয়, সেন বংশের এক রাজা এ অঞ্চলে পূজা-অর্চনার জন্য ব্রাহ্মণের অভাব দেখে কান্যকুব্জ থেকে কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবার আনিয়েছিলেন। তাঁদের কয়েকটি পরিবার আজকের শহরের মৌলভীপাড়া এলাকায় বসতি গড়েন, আর সেই 'ব্রাহ্মণদের বাড়ি' থেকেই নাম হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

আরেকটি জনশ্রুতি এর সঙ্গে সুফি সাধক কাজী মাহমুদ শাহের নাম জুড়ে দেয়। স্থানীয় উপভাষায় জেলাটিকে 'বাউনবাইড়া' বলা হয়, আর সংক্ষেপে অনেকে লেখেন 'বি-বাড়িয়া'। তবে জেলা প্রশাসন দাপ্তরিক কাজে পূর্ণ নাম ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছে।

সমতট থেকে আধুনিক জেলা

প্রাচীনকালে এ অঞ্চল ছিল সমতট ও হরিকেল জনপদের অংশ। মধ্যযুগে দীর্ঘদিন এটি ত্রিপুরা রাজ্যের অধীনে ছিল। ১৫১৩ সালের দিকে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ত্রিপুরার কাছ থেকে এ এলাকা দখল করেন। বারো ভূঁইয়াদের প্রধান ঈসা খাঁর নামও সরাইলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মোগল আমলে সরাইল পরগনা সিলেট সরকারের অধীনে ছিল, আর এ অঞ্চলের মসলিন কাপড়ের সুনাম ছিল।

ব্রিটিশ আমলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিল ত্রিপুরা জেলার, পরে কুমিল্লা নামে পরিচিত জেলার একটি মহকুমা। উনিশ শতকের শেষ ভাগে শহরে পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা থেকে আলাদা হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।

আখাউড়া, দরুইন আর একাত্তর

সীমান্তঘেঁষা এই জেলা মুক্তিযুদ্ধে ছিল ২ নম্বর সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গন। ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল আখাউড়ার দরুইন গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল। সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ দিতে তিনি একা অবস্থান ধরে রেখেছিলেন। পরে তাঁকে সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব বীরশ্রেষ্ঠে ভূষিত করা হয়, আর দরুইনেই তাঁর সমাধি।

কসবার কুল্লাপাথরে একটি সমাধিস্থলে শায়িত আছেন অনেক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, জায়গাটি এখন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষিত। যুদ্ধের শেষ দিকে পিছু হটার সময় পাকিস্তানি বাহিনী আশুগঞ্জ-ভৈরব রেলসেতুর একাংশ উড়িয়ে দেয়। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শত্রুমুক্ত হয়।

তিতাস, মেঘনা আর গ্যাস

জেলার পশ্চিম সীমানা দিয়ে বয়ে গেছে মেঘনা, আর ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে গেছে তিতাস। এ ছাড়া বুড়ি ও অন্যান্য ছোট নদী আর অনেক বিল-হাওর জেলাজুড়ে ছড়িয়ে আছে। সমতল উর্বর জমিতে ধান প্রধান ফসল, বিলে মাছ ধরা বহু মানুষের জীবিকা। বর্ষায় তিতাসে নৌকাবাইচের আয়োজন এখনো বড় উৎসব।

তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অর্থনৈতিক গুরুত্বের বড় কারণ প্রাকৃতিক গ্যাস। তিতাস গ্যাসক্ষেত্র দেশের অন্যতম বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র, এখান থেকে ঢাকাসহ বহু অঞ্চলে গ্যাস যায়। মেঘনার পাড়ে আশুগঞ্জে আছে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা আর নদীবন্দর। আখাউড়া দেশের বড় রেল জংশনগুলোর একটি, আর আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের ত্রিপুরার সঙ্গে বাণিজ্য চলে।

সুরের ঘর: সংগীত আর সাহিত্য

নবীনগরের শিবপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ মধ্যপ্রদেশের মাইহারে গিয়ে রাজসভার সংগীতজ্ঞ হন এবং মাইহার ঘরানার ধারা গড়ে তোলেন। তাঁর ছেলে সরোদশিল্পী আলী আকবর খাঁর জন্মও শিবপুরে। আলাউদ্দিন খাঁর বড় ভাই ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁও ছিলেন গুণী সংগীতজ্ঞ। জেলা শহরে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর নামে সংগীতাঙ্গন রয়েছে।

শুধু শাস্ত্রীয় সংগীত নয়, জারি, সারি, বাউল, কবিগান, পালাগান আর যাত্রার চর্চাও এখানে দীর্ঘদিনের। নবীনগরের কৃষ্ণনগর গ্রামের বিপিন পালকে এ অঞ্চলের পুতুলনাচের এক পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণ করা হয়। আর অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস পরে ঋত্বিক ঘটকের হাতে চলচ্চিত্র হয়ে আরও বহু মানুষের কাছে পৌঁছেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যা দেখবেন

জেলা শহরের মেড্ডায় কালভৈরব মন্দিরের বিশাল ভৈরব মূর্তি দেশের সবচেয়ে বড় শিবমূর্তিগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। সরাইলের আরিফাইল মসজিদ সতেরো শতকের মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন, আর একই এলাকার হাতিরপুল এক সময় হাতি চলাচলের পথে তৈরি বলে প্রচলিত। নাসিরনগরের হরিপুর জমিদারবাড়ি তিতাসের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুরোনো রাজবাড়ি, যেখানে বহু চলচ্চিত্রের দৃশ্যধারণ হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি দেখতে চাইলে কসবার কুল্লাপাথর শহীদ সমাধিস্থল আর আখাউড়ার দরুইনে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধি ঘুরে আসা যায়। কসবার সীমান্ত হাটও কৌতূহলী ভ্রমণকারীদের কাছে আকর্ষণীয়।

নাসিরনগরের গোকর্ণে আছে নবাববাড়ির পুরোনো স্থাপনা, যার সঙ্গে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের এক সময়ের সভাপতি সৈয়দ শামসুল হুদার পরিবারের নাম জড়িয়ে আছে। আর বিকেলে তিতাসের কোনো খেয়াঘাটে বসে থাকলে দেখা যায় জেলেদের নৌকা ফিরছে, পাড়ে জাল শুকাচ্ছে, ঠিক যেন উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা দৃশ্য।

মিষ্টির দোকানে এক বিশেষ স্বাদ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিষ্টির দোকানে ঢুকলে কাচের তাকে দেখা যাবে ছোট ছোট চারকোনা সাদা মিষ্টি, গায়ে চিনির শুকনো আস্তরণ। এই হলো ছানামুখী। ছানাকে ছোট টুকরো করে কেটে ঘন চিনির সিরায় জ্বাল দিয়ে শুকিয়ে তৈরি হয় এই মিষ্টি, ফলে বাইরে মচমচে চিনির পরত আর ভেতরে নরম ছানা। প্রচলিত আছে, ব্রিটিশ আমলে কাশী থেকে আসা মহাদেব পাঁড়ে নামের এক কারিগরের হাতে এর শুরু, আর তাঁর নামে শহরের পুরোনো দোকানটি এখনো চলছে। সম্প্রতি ছানামুখী ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে।

ছানামুখীর পাশাপাশি এখানকার রসগোল্লারও কদর আছে। আত্মীয়বাড়ি বেড়াতে গেলে বা বিদেশে থাকা স্বজনের জন্য উপহার পাঠাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ এখনো হাঁড়ি ভরে মিষ্টি কেনেন। আর তিতাস ও মেঘনার মাছ, বিলের টাটকা মাছের ঝোল প্রতিদিনের খাবারের মূল অংশ। আরও জানতে দেখুন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিখ্যাত খাবার।

যাতায়াত ও ঘোরার সময়

ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়া বেশ সহজ। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রেলপথ এই জেলা দিয়ে গেছে, তাই ট্রেনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা আখাউড়া স্টেশনে নামা যায়। সড়কপথেও নিয়মিত বাস চলে।

শীতকাল, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, পুরোনো স্থাপনা আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্থান ঘোরার জন্য আরামদায়ক। তবে তিতাসের ভরা রূপ আর নৌকাবাইচ দেখতে চাইলে বর্ষার শেষ ভাগে যাওয়াই ভালো।

সাধারণ প্রশ্ন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী কী?

ছানামুখী হলো ছোট চারকোনা ছানার টুকরো চিনির সিরায় জ্বাল দিয়ে শুকিয়ে তৈরি মিষ্টি, যা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃত।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্ম কোথায়?

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কবে গঠিত হয়?

কুমিল্লা জেলার মহকুমা ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পূর্ণাঙ্গ জেলা হয়।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 চট্টগ্রাম বিভাগের অন্য জেলা