চাঁদপুর জেলা: তিন নদীর মোহনায় ইলিশের বাড়ি
চট্টগ্রাম বিভাগ · ৮টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
সন্ধ্যার আগে চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশনের পাথুরে বাঁধে দাঁড়ালে চোখের সামনে জল ছাড়া আর কিছু থাকে না। বাঁ দিক থেকে আসে পদ্মা, সামনে বিশাল মেঘনা, আর শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে এসে মিশে যায় ছোট্ট ডাকাতিয়া। তিন নদীর এই মোহনায় জেলেদের নৌকা ভেসে থাকে, দূরে লঞ্চের বাঁশি বাজে, আর ঘাটের পাশের দোকানে তেলে ছাড়া হয় সদ্য ধরা ইলিশ। চাঁদপুর জেলাকে যে মানুষ "ইলিশের বাড়ি" বলে ডাকে, তার কারণ এখানে এলে একবেলাতেই বোঝা যায়। তবে এই জেলার পরিচয় শুধু মাছে আটকে নেই; নদীবন্দর, পুরোনো জমিদারবাড়ি, বিশাল মসজিদ আর মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ প্রতিরোধের স্মৃতিও এর গল্পের অংশ।
চাঁদপুর নামটি কোথা থেকে এল
নামের উৎস নিয়ে একক কোনো মীমাংসিত উত্তর নেই, আছে কয়েকটি প্রচলিত কাহিনি। সবচেয়ে বেশি শোনা যায় চাঁদ রায়ের কথা। প্রচলিত আছে, বারো ভূঁইয়াদের আমলে বিক্রমপুরের জমিদার চাঁদ রায় এই অঞ্চলে একটি শাসনকেন্দ্র গড়েছিলেন, আর তাঁর নামেই জায়গাটির নাম হয় চাঁদপুর। আরেক মত বলে, শহরের কোড়ালিয়া এলাকার এক সাধক চাঁদ ফকিরের নাম থেকে এসেছে এই নাম। কেউ কেউ শাহ আহমদ চাঁদ নামে এক শাসকের কথা বলেন, যিনি নাকি এখানে নদীবন্দর গড়েছিলেন। আবার মনসামঙ্গলের বণিক চাঁদ সওদাগরের নৌকা এই পথে বাণিজ্যে আসত, এমন লোককথাও আছে। কোনটি সত্য তা বলা কঠিন, কিন্তু প্রতিটি গল্পেই নদী আর বাণিজ্যের একটা ছায়া আছে, যা এই জেলার চরিত্রের সঙ্গে মিলে যায়।
সমতট থেকে আধুনিক জেলা
প্রাচীন কালে এই অঞ্চল সমতট জনপদের অংশ ছিল বলে ধরা হয়, যে সমতটের কথা সপ্তম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের বিবরণেও এসেছে। মধ্যযুগে মেঘনার তীরের এই জায়গা নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হয়ে ওঠে। ইংরেজ জরিপকারী জেমস রেনেলের আঠারো শতকের মানচিত্রেও চাঁদপুরের নাম পাওয়া যায়।
ব্রিটিশ আমলে অঞ্চলটি ছিল পুরোনো ত্রিপুরা জেলার অধীন, যা পরে কুমিল্লা নামে পরিচিত হয়। ১৮৭৮ সালে চাঁদপুর মহকুমা গঠিত হয়। রেলপথ আর স্টিমারঘাট মিলে উনিশ শতকের শেষ থেকে চাঁদপুর হয়ে ওঠে পূর্ববঙ্গের ব্যস্ত নদীবন্দরগুলোর একটি, যেখানে ট্রেন থেকে নেমে যাত্রী আর মালপত্র স্টিমারে উঠত। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সময় কুমিল্লা থেকে আলাদা হয়ে চাঁদপুর পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
একাত্তরের চাঁদপুর
মুক্তিযুদ্ধে চাঁদপুর ছিল ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, শাহরাস্তির সূচিপাড়া থেকে ফরিদগঞ্জের নিচু অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা যুদ্ধের নয় মাস স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের প্রতিরোধে পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। এর বিপরীত ছবিও আছে: হাজীগঞ্জের রঘুনাথপুর বাজার ও হামিদিয়া জুট মিলস এলাকায় গণহত্যা চালানো হয়, নাসিরকোটে রয়েছে গণকবর। মতলব উত্তরের নিশ্চিন্তপুরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি মাঠ-হাসপাতাল চালু ছিল বলে জানা যায়। আজ ফরিদগঞ্জের "অঙ্গীকার" ভাস্কর্য, মতলবের "দীপ্ত বাংলা" আর শহরের "রক্তধারা" স্মৃতিস্তম্ভ সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
নদী, চর আর জীবিকা
চাঁদপুরের পশ্চিম সীমানা জুড়ে বয়ে চলেছে মেঘনা, আর জেলার ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে গেছে ডাকাতিয়া ও ধনাগোদা। নদীর ভাঙন এখানকার মানুষের পুরোনো সঙ্গী; হাইমচরের মতো এলাকায় চর জাগে, আবার নদীতে হারিয়েও যায়। জমি সমতল আর পলিমাটির, তাই ধান, পাট, গম, আলু আর আখের চাষ ভালো হয়। জেলার অর্থনীতির মূল ভিত কৃষি হলেও মাছ ধরা এখানে প্রায় একটি সংস্কৃতি। জেলার বড় একটি অংশের মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মৎস্যখাতের সঙ্গে যুক্ত। বড় স্টেশনের মাছঘাটে ভোর থেকে ইলিশের নিলাম চলে, সেখান থেকে বরফে মুড়ে মাছ যায় দেশের নানা প্রান্তে। ইলিশ রক্ষায় প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ থাকে, তখন জেলেপাড়ার জীবনও খানিকটা থমকে যায়।
প্রবাসী আয়ও এখানকার অনেক পরিবারের বড় ভরসা। মতলবের নাম আবার দেশের বাইরেও পরিচিত, কারণ সেখানে কয়েক দশক ধরে চলা স্বাস্থ্য গবেষণা জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে।
মানুষ, মসজিদ আর মেলা
নদীর দেশে মানুষের মন খোলা, আড্ডাপ্রিয়। লঞ্চঘাটের চায়ের দোকান থেকে হাটবাজার পর্যন্ত গল্প চলে মাছের দর আর নদীর মেজাজ নিয়ে। হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ এই জেলার ধর্মীয় ও স্থাপত্য পরিচয়ের বড় চিহ্ন, দেশের বড় মসজিদগুলোর একটি হিসেবে এটি পরিচিত। শাহরাস্তিতে আছে প্রাচীন মাজার, যেখানে বছরজুড়ে ভক্তদের আনাগোনা থাকে। হিন্দু সম্প্রদায়ের রথযাত্রা আর দুর্গাপূজাও শহরে বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে হয়।
এই জেলার মাটি অনেক গুণী মানুষ দিয়েছে। শিল্পী হাশেম খান চাঁদপুরের সন্তান; জেলার "ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর" প্রতীকের নকশাও তাঁর করা। জাতীয় অধ্যাপক ও বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের জন্মও এই জেলায়। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরীও চাঁদপুরের মানুষ।
যেখানে ঘুরে আসা যায়
- বড় স্টেশন মোলহেড: তিন নদীর মোহনা, সূর্যাস্ত দেখার জন্য জেলার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।
- ইলিশ চত্বর: শহরের মাঝখানে ইলিশের ভাস্কর্য, চাঁদপুরের পরিচয়ের প্রতীক।
- হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ: বিশাল আয়তন আর কারুকাজের জন্য দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে।
- রূপসা জমিদারবাড়ি: ফরিদগঞ্জের পুরোনো জমিদারবাড়ি, যার স্থাপত্যে পুরোনো আমলের ছাপ রয়ে গেছে।
- লোহাগড় মঠ: ফরিদগঞ্জের উঁচু প্রাচীন মঠ, যা ঘিরে স্থানীয় নানা লোককাহিনি প্রচলিত।
- মেঘনার চরাঞ্চল: শহরের কাছের চরগুলোতে নৌকায় ঘুরতে গিয়ে নদীর অন্য রূপ দেখা যায়।
চাঁদপুরের রান্নাঘরে ইলিশ
এই জেলায় ইলিশ শুধু একটা মাছ নয়, অতিথি আপ্যায়নের মাপকাঠি। মেঘনার ইলিশ চওড়া পেট আর তেলতেলে স্বাদের জন্য আলাদা করে খ্যাত, আর স্থানীয়রা দাবি করেন নদীর মিঠা পানির কারণেই এর স্বাদ বেশি। ঘাটের হোটেলে গেলে প্রথমেই আসে ইলিশ ভাজা: হলুদ-লবণ মেখে সর্ষের তেলে কড়া করে ভাজা টুকরো, আর সেই তেলেই গরম ভাত মেখে খাওয়া। এর সঙ্গে একটু শুকনো মরিচ ভাজা থাকলে আর কিছু লাগে না।
বাড়ির রান্নায় সবচেয়ে কদর সর্ষে ইলিশের। বাটা সর্ষে, কাঁচা মরিচ আর সর্ষের তেলের ঝাঁঝে মাছের টুকরোগুলো কেউ ভাপে দেন, কেউ অল্প আঁচে রাঁধেন। বর্ষার মৌসুমে ডিমওয়ালা ইলিশ এলে মাছের ডিম আলাদা করে ভুনা বা ভাজা হয়; অনেক ঘরে এটাই শিশুদের সবচেয়ে প্রিয় পদ। ইলিশের মাথা দিয়ে কচুশাক বা ডাল রান্নাও এখানকার চেনা স্বাদ। জেলার কোন হোটেলে কী পাওয়া যায় আর মানুষ কোন খাবারের কথা বেশি বলে, তা দেখতে পারেন চাঁদপুরের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাওয়ার পথ ও সময়
ঢাকা থেকে চাঁদপুর যাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় পথ নদী। সদরঘাট থেকে নিয়মিত লঞ্চ ছাড়ে, আর মেঘনার বুক চিরে যাওয়ার এই যাত্রাটাই অনেকের কাছে ভ্রমণের আসল আনন্দ। সড়কপথে বাসেও যাওয়া যায়, আর চট্টগ্রাম বা কুমিল্লা দিক থেকে রেলপথেও চাঁদপুর পৌঁছানো সম্ভব। ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে বর্ষা ও শরতের শুরু, মোটামুটি শ্রাবণ থেকে আশ্বিন, সবচেয়ে ভালো সময়; তবে নিষেধাজ্ঞার সময়টা আগে জেনে নেওয়া ভালো। আর নদী শান্ত থাকে বলে আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য শীতকালও উপযুক্ত।
সাধারণ প্রশ্ন
চাঁদপুরকে ইলিশের বাড়ি বলা হয় কেন?
পদ্মা-মেঘনার মোহনায় প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে এবং এখানকার মাছঘাট থেকে সারা দেশে ইলিশ সরবরাহ হয়। মেঘনার ইলিশের স্বাদও আলাদা করে খ্যাত।
চাঁদপুর কবে জেলা হয়?
ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৮ সালে চাঁদপুর মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালে কুমিল্লা থেকে আলাদা হয়ে এটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হয়।
চাঁদপুরে কোন জায়গা থেকে তিন নদীর মিলন দেখা যায়?
শহরের বড় স্টেশন এলাকার মোলহেড থেকে পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মোহনা দেখা যায়। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে সবচেয়ে বেশি ভিড় থাকে।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh