চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা: গৌড়ের মাটিতে আমের রাজত্ব
রাজশাহী বিভাগ · ৫টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
জ্যৈষ্ঠের ভোরে কানসাটের আমবাজারে দাঁড়ালে মনে হবে পুরো জেলাটাই যেন ঝুড়িভর্তি আম নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। ভ্যান, ট্রাক আর সাইকেলের পেছনে বাঁধা খাঁচা থেকে পাকা আমের ঘ্রাণ ছড়ায়। আবার সেই একই সড়ক ধরে সীমান্তের দিকে এগোলে শিবগঞ্জে পাওয়া যাবে পাঁচ শ বছরেরও বেশি পুরোনো মসজিদ, প্রাচীন গৌড় নগরের অবশিষ্ট অংশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের পশ্চিম প্রান্তে, পদ্মা আর মহানন্দার মাঝে। স্থানীয়রা আদর করে ডাকেন শুধু ‘চাঁপাই’, আর দেশের মানুষ চেনে আমের রাজধানী নামে।
চম্পক থেকে চাঁপাই, নবাব থেকে নবাবগঞ্জ
জেলার নামটি দুই অংশের মিলন। প্রচলিত আছে, ‘চাঁপাই’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘চম্পক’ থেকে। ‘নবাবগঞ্জ’ অংশ নিয়ে বলা হয়, বাংলার নবাবেরা এই অঞ্চলে শিকারে আসতেন, আর নবাব আলীবর্দী খাঁর সময়ে এখানে নবাবগঞ্জ নামে একটি গঞ্জ গড়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালে জেলা হওয়ার সময় সরকারি নাম ছিল শুধু নবাবগঞ্জ। জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবিতে ২০০১ সালের ১ আগস্ট থেকে সরকারিভাবে নাম হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
গৌড়ের রাজধানী থেকে সীমান্ত জেলা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাস প্রাচীন পুণ্ড্র, বরেন্দ্র আর গৌড়ের সঙ্গে জড়ানো। পাল ও সেন আমল পেরিয়ে বাংলার স্বাধীন সুলতানদের সময়ে গৌড় ছিল বাংলার রাজধানী। সেই বিশাল নগরের বড় অংশ এখন ভারতের মালদহে, কিন্তু একটি অংশ পড়েছে শিবগঞ্জ উপজেলায়। এখানেই দাঁড়িয়ে আছে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের আমলে তৈরি ছোট সোনা মসজিদ। একসময় এর গম্বুজগুলো সোনালি রঙে মোড়া ছিল, সেখান থেকেই নাম। কালো পাথরের দেয়ালে লতাপাতার সূক্ষ্ম খোদাই দেখে বোঝা যায় সুলতানি স্থাপত্য কতটা পরিণত ছিল। কাছেই ১৪৭৯ সালের দারাসবাড়ি মসজিদ, পোড়ামাটির অলংকরণে সমৃদ্ধ, আর মুঘল আমলের তাহখানা, যা শাহ সুজার সময়ের বলে পরিচিত।
ব্রিটিশ আমলে এলাকাটি মালদহ জেলার অংশ ছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগে এটি পূর্ববঙ্গে আসে এবং রাজশাহী জেলার মহকুমা হয়। ১৯৫০ সালে নাচোলে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে সাঁওতাল ও বাঙালি কৃষকদের তেভাগা আন্দোলন ইতিহাসে নাচোল বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর মুক্ত করার যুদ্ধে শহীদ হন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। মহানন্দা পার হয়ে শত্রুর অবস্থানে আক্রমণের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেওয়া হয়, আর তাঁর সমাধি ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে।
পদ্মা, মহানন্দা আর বরেন্দ্রের আমবাগান
শিবগঞ্জের কাছে গঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পদ্মা নাম নেয়, তাই এই জেলাকে পদ্মার প্রবেশদ্বারও বলা যায়। জেলা শহর মহানন্দার তীরে; পাগলা আর পুনর্ভবা নদীও এই জেলা দিয়ে বয়ে গেছে। পদ্মার চরে বর্ষায় পানি ওঠে, আর নাচোল-গোমস্তাপুরের দিকে উঁচু বরেন্দ্র ভূমির লাল মাটি।
এই জেলার অর্থনীতির প্রাণ আম। শিবগঞ্জ, ভোলাহাট আর গোমস্তাপুরে মাইলের পর মাইল আমবাগান, আর গ্রীষ্মে আম কেনাবেচা ঘিরে লাখো মানুষের কাজ জোটে। আমের বছরের হিসাব শুরু হয় শীতের শেষে, যখন গাছে মুকুল আসে আর পুরো এলাকা মুকুলের মৃদু ঘ্রাণে ভরে যায়। তারপর গুটি আম, শিলাবৃষ্টি আর ঝড়ের দুশ্চিন্তা, আর শেষে জ্যৈষ্ঠে পাকা আম পাড়ার উৎসব। বাগান মালিক, পাইকার, ঝুড়ি বোনার কারিগর, ভ্যানচালক, কুরিয়ার সার্ভিস, এমনকি শহরের ছোট হোটেলও এই কয়েক মাসের ওপর নির্ভর করে। আমের মৌসুমে জেলার বাইরে থেকে আসা মৌসুমি শ্রমিকেরাও বাগানে কাজ খুঁজে নেন। ধান, গম আর সবজিও হয়। ভোলাহাটে রেশম চাষ ও রেশমি কাপড়ের ঐতিহ্য আছে। সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যও এই জেলার বড় আয়ের উৎস।
গম্ভীরার দেশ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংস্কৃতির সবচেয়ে আলাদা পরিচয় গম্ভীরা গান। মঞ্চে নানা আর নাতির বেশে দুজন শিল্পী সংলাপ আর গানের ভেতর দিয়ে সমাজের নানা অসংগতি, দ্রব্যমূল্য, কৃষকের দুঃখ নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেন। দর্শকেরা হাসতে হাসতেই গুরুতর কথাগুলো শুনে ফেলেন। আঞ্চলিক ভাষার মিষ্টতা আর ব্যঙ্গের ধার মিলে গম্ভীরা এ অঞ্চলের নিজস্ব সম্পদ। গম্ভীরা নামটির পেছনেও ইতিহাস আছে; প্রচলিত আছে, এর শিকড় শিবের উপাসনাকে ঘিরে পুরোনো লোকাচারে, পরে সময়ের সঙ্গে এটি সামাজিক ব্যঙ্গের গানে রূপ নেয়। নাচোল আর গোমস্তাপুরের বরেন্দ্র এলাকায় সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস, তাঁদের নিজস্ব উৎসব আর নাচ-গানও জেলার সংস্কৃতির অংশ। এখানকার আঞ্চলিক কথ্য ভাষার টান ও শব্দভান্ডার আশপাশের জেলার থেকেও কিছুটা আলাদা, যা গম্ভীরার সংলাপে আরও স্পষ্ট শোনা যায়। দেশের প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী এই জেলারই সন্তান।
যেখানে সময় থমকে থাকে
- ছোট সোনা মসজিদ ও বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরের সমাধি, শিবগঞ্জ
- দারাসবাড়ি মসজিদ ও মাদ্রাসার ধ্বংসাবশেষ
- তাহখানা কমপ্লেক্স, মুঘল আমলের দোতলা ভবন ও পুকুর
- খনিয়া দীঘি মসজিদ, ঘন গাছপালার মধ্যে
- কানসাটের আমবাজার, গ্রীষ্মে জীবন্ত এক দৃশ্য
আম, কালাই রুটি আর হাঁসের মাংস
চাঁপাইয়ের আমের তালিকা লম্বা: গোপালভোগ দিয়ে মৌসুম শুরু, তারপর ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, আর শেষে ফজলি ও আশ্বিনা। এখানকার ক্ষীরশাপাতি আম ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। আম শুধু ফল হিসেবে নয়, কাঁচা আমের ডাল, আমচুর আর আমসত্ত্ব হিসেবেও রান্নাঘরে ঘোরে। গ্রীষ্মের দুপুরে কাঁচা আমের টক ডাল আর গরম ভাত, বিকেলে লবণ-মরিচ মাখা কাঁচা আম, আর রাতে দুধ-আম দিয়ে ভাত; মৌসুমের কয়েক মাস চাঁপাইয়ের রান্নাঘর যেন আমকে ঘিরেই চলে। পাকা আমের রস রোদে শুকিয়ে তৈরি আমসত্ত্ব সারা বছর রেখে খাওয়া হয়।
তবে চাঁপাইয়ের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় সকালের নাশতা হয়তো কালাই রুটি। মাষকলাইয়ের আটার সঙ্গে চালের আটা মিশিয়ে হাতে চাপড়ে মোটা রুটি বানানো হয়, মাটির খোলায় সেঁকা। সঙ্গে থাকে বেগুন ভর্তা, মরিচ-পেঁয়াজ বাটা কিংবা ঝাল করে রাঁধা হাঁসের মাংস। শীতের রাতে শহরের মোড়ে মোড়ে কালাই রুটির দোকানে ধোঁয়া ওঠে, আর হাঁসের মাংসের ঝোলে রুটি ডুবিয়ে খাওয়ার জন্য মানুষ লাইন দেয়। জেলার আরও খাবারের খোঁজ পাবেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাওয়া-আসা
ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সড়কপথে রাজশাহী হয়ে যাওয়া যায়। রেলপথেও সরাসরি ট্রেন আছে, রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত। আম দেখতে আর খেতে হলে মে থেকে জুলাই সবচেয়ে ভালো সময়; আর কালাই রুটি ও প্রত্নস্থল ঘোরার জন্য শীতকাল আরামদায়ক।
সাধারণ প্রশ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জকে আমের রাজধানী বলা হয় কেন?
শিবগঞ্জ, ভোলাহাট ও গোমস্তাপুরে বিস্তীর্ণ আমবাগান থাকায় এই জেলা দেশের প্রধান আম উৎপাদন এলাকা। ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, ফজলিসহ নানা জাতের আম এখান থেকে সারা দেশে যায়।
ছোট সোনা মসজিদ কোথায় এবং কবে তৈরি?
ছোট সোনা মসজিদ শিবগঞ্জ উপজেলায়, প্রাচীন গৌড় এলাকায়। এটি সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের শাসনামলে (১৪৯৩-১৫১৯) নির্মিত।
গম্ভীরা গান কী?
গম্ভীরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের লোকগান, যেখানে নানা-নাতির সংলাপে সমাজের নানা সমস্যা নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়। আঞ্চলিক ভাষায় পরিবেশিত এই গান এ অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্য।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh