চুয়াডাঙ্গা জেলা: সীমান্তের শহর, খেজুর রসের দেশ
খুলনা বিভাগ · ৪টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
শীতের ভোরে চুয়াডাঙ্গার গ্রামের রাস্তায় হাঁটলে প্রথমে নাকে আসে ধোঁয়ার গন্ধ, তারপর জ্বাল দেওয়া রসের মিষ্টি ঘ্রাণ। মাটির উনুনে বড় বড় তাফালে খেজুরের রস ফুটছে, পাশে গাছিরা কাঁধে ভাঁড় ঝুলিয়ে ফিরছেন। পশ্চিম সীমান্তঘেঁষা এই ছোট জেলাটি আকারে বড় নয়, কিন্তু এর গায়ে লেগে আছে একাত্তরের এক বিশেষ অধ্যায়, ব্রিটিশ আমলের রেলপথ আর নীলচাষের কালো স্মৃতি। খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গা জেলা তাই শুধু গুড়ের জন্য নয়, ইতিহাসের জন্যও মনে রাখার মতো।
নামটি এল কোথা থেকে
চুয়াডাঙ্গা নামের উৎস নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে গল্পটি শোনা যায়, তা এক পরিবারকে ঘিরে। প্রচলিত আছে, আঠারো শতকের মাঝামাঝি চুঙ্গো মল্লিক নামে এক ব্যক্তি সপরিবারে নদীপথে এসে এখানে বসতি গড়েন। তাঁর নাম থেকে জায়গাটি চুঙ্গোডাঙ্গা নামে পরিচিত হয়, পুরোনো এক নথিতেও এই নামের উল্লেখ পাওয়া যায় বলে স্থানীয় গবেষকেরা বলেন। পরে ফারসি ও ইংরেজি নথির উচ্চারণ ঘুরে নামটি দাঁড়ায় চুয়াডাঙ্গা। আরেকটি মত বলে, "চুয়া" শব্দে পরিষ্কার উঁচু জমি বোঝাত, আর "ডাঙ্গা" মানে তো শুকনো ডাঙা। কেউ কেউ আবার রসিকতা করে বলেন, এক সময় এখানে ইঁদুরের এত উপদ্রব ছিল যে হিন্দি "চুহা" থেকেই নাম। কোন ব্যাখ্যা সত্য, তা নিশ্চিত নয়, তবে প্রথমটিই স্থানীয়ভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য।
প্রাচীন গঙ্গারিডই থেকে নদীয়ার মহকুমা
ইতিহাসবিদদের অনেকে মনে করেন, গ্রিক লেখকদের বর্ণনায় যে গঙ্গারিডই জনপদের কথা আছে, এই অঞ্চল তার কাছাকাছি ছিল। পরে সেন রাজাদের শাসন, সুলতানি ও মুঘল আমল পেরিয়ে এলাকাটি নদীয়ার রাজাদের প্রভাবে আসে। ব্রিটিশ যুগে চুয়াডাঙ্গা ছিল নদীয়া জেলার একটি মহকুমা।
এই সময়েই এখানে আসে রেলপথ। উনিশ শতকের ষাটের দশকে কলকাতা থেকে কুষ্টিয়ামুখী রেললাইন চালু হলে চুয়াডাঙ্গা স্টেশন গড়ে ওঠে, আর সেই সূত্রে দর্শনা হয়ে ওঠে সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ। একই শতকে নীলকরদের অত্যাচারও দেখেছে এই মাটি। ঘোলদাড়ি ও কার্পাসডাঙ্গার নীলকুঠির ভাঙা দেয়াল আজও সেই সময়ের সাক্ষী, আর নীল বিদ্রোহে এ অঞ্চলের কৃষকেরাও অংশ নিয়েছিলেন।
১৯৪৭ সালের দেশভাগে চুয়াডাঙ্গা মহকুমার বেশির ভাগ অংশ পূর্ব পাকিস্তানের কুষ্টিয়া জেলায় যুক্ত হয়। ১৯৮৪ সালে চুয়াডাঙ্গা আলাদা জেলা হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
একাত্তর: অস্থায়ী রাজধানীর গল্প
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চুয়াডাঙ্গা ছিল প্রতিরোধের এক কেন্দ্র। মার্চের শেষে এখানেই দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের সামরিক কমান্ড গড়ে ওঠে, ইপিআরের স্থানীয় সদর দপ্তর থেকে সংগঠিত হয় প্রতিরোধ। এপ্রিলের প্রথম ভাগে প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে চুয়াডাঙ্গাকে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর পাকিস্তানি বাহিনী শহরে বিমান হামলা চালায়, ফলে শপথ অনুষ্ঠান সরিয়ে নেওয়া হয় পাশের মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়, যার নাম পরে হয় মুজিবনগর।
পরের মাসগুলোতে জেলাজুড়ে শতাধিক ছোট-বড় সংঘর্ষ হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের পেছনের জায়গাটি হয়ে উঠেছিল বধ্যভূমি। দামুড়হুদার নাটুদহে আট শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর "আট কবর" নামে পরিচিত, সেখানে এখন স্মৃতিসৌধ ও স্মৃতি কমপ্লেক্স গড়ে উঠেছে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চুয়াডাঙ্গা শত্রুমুক্ত হয়।
মাথাভাঙ্গার জল আর সমতল মাঠ
জেলার বুক চিরে বয়ে গেছে মাথাভাঙ্গা নদী, তার সঙ্গে আছে ভৈরব, চিত্রা, নবগঙ্গা আর কুমার। ছোট ছোট বিল ও বাঁওড়ও কম নয়। মাটি সমতল ও উর্বর, তাই এখানকার মানুষের বড় অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ধান, পাট, ভুট্টা, পান আর সবজির পাশাপাশি তুলাও এখানে অর্থকরী ফসল। আলমডাঙ্গা ও জীবননগরের মাঠে শীতকালে সবজির সবুজ আর হলুদ সরিষার ফুল একসঙ্গে চোখে পড়ে।
শিল্পের দিক থেকে চুয়াডাঙ্গার সবচেয়ে পুরোনো পরিচয় দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানি। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানায় চিনি তৈরির পাশাপাশি ডিস্টিলারিও রয়েছে, যা দেশের এ ধরনের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। আশপাশের আখচাষিদের জীবিকা বহু দশক ধরে এই কারখানার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
দর্শনার আরেকটি পরিচয় সীমান্ত। ওপারে পশ্চিমবঙ্গের গেদে, আর এই রেলপথ ধরেই ঢাকা-কলকাতার মৈত্রী এক্সপ্রেস চলাচল করে। ফলে ছোট্ট এই শহরে সীমান্ত বাণিজ্য, রেল কলোনি আর চিনিকলের শ্রমিকপাড়া মিলে একটা আলাদা মিশ্র চরিত্র তৈরি হয়েছে। শহরের রেলস্টেশনের পুরোনো লাল ইটের ভবন, প্ল্যাটফর্মের পাশে চায়ের দোকান আর ভোরের মালগাড়ির শব্দ, এসব মিলিয়ে দর্শনায় এখনো একটা পুরোনো রেলশহরের আমেজ টের পাওয়া যায়।
গান, মেলা আর মাজার
চুয়াডাঙ্গা কুষ্টিয়ার কাছের জেলা, তাই লালনের ভাবধারার ছোঁয়া এখানেও গভীর। মুর্শিদি, মারফতি আর বাউল গানের আসর গ্রামে গ্রামে বসে। পুরোনো দিনে মানিক পীরের গান, গাজীর গান, কবিগান আর যাত্রাপালাও ছিল জনপ্রিয়। লালনগীতির পরিচিত শিল্পী খোদা বক্স সাঁই ছিলেন এই অঞ্চলের মানুষ, একুশে পদক পেয়েছিলেন তিনি। গড়াইটুপির আমবাতি মেলা বহু পুরোনো, গ্রামবাংলার হাটমেলার চেহারা এখনো সেখানে কিছুটা টিকে আছে।
ঘুরে দেখার জায়গা
চুয়াডাঙ্গায় দেখার মতো জায়গাগুলো ছড়ানো, কিন্তু প্রতিটির সঙ্গে একটা গল্প আছে। আলমডাঙ্গার ঘোলদাড়ি জামে মসজিদ জেলার প্রাচীনতম স্থাপনাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। ঠাকুরপুর মসজিদ সতেরো শতকের শেষ ভাগের। দামুড়হুদার নাটুদহে আট কবর স্মৃতি কমপ্লেক্সে একাত্তরের শহীদদের স্মরণে নীরব কিছুটা সময় কাটানো যায়। দর্শনায় কেরু চিনিকল ও তার পুরোনো কলোনি এলাকাও দেখার মতো। আর শহরের কাছে মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়ে সন্ধ্যা নামা দেখা এখানকার মানুষের প্রিয় অবসর।
খেজুর রসের মৌসুম ও ঘরের খাবার
চুয়াডাঙ্গার খাবারের গল্প শুরু হয় শীতে। কার্তিকের শেষ থেকে গাছিরা খেজুর গাছ "তোলা" শুরু করেন, অর্থাৎ ডাল ছেঁটে গাছের মাথা চেঁছে নল বসান। সন্ধ্যায় হাঁড়ি ঝোলানো হয়, ভোরে নামানো হয় ঠান্ডা রস। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় ঝোলা গুড় আর পাটালি। এখানকার গুড়ের হাটে শীতের সকালে বেপারীদের ভিড় জমে, দেশের নানা প্রান্তে ট্রাকে করে গুড় যায়।
গুড় থাকলে পিঠা থাকবেই। ভাপা পিঠার ভেতরে খেজুর গুড়ের পুর, দুধ আর গুড়ে ভেজানো রসের পিঠা, পাটালি দিয়ে চিতই: শীতের সকাল আর সন্ধ্যা এখানে পিঠার গন্ধে ভরে থাকে। নতুন চালের গুঁড়া আর নতুন গুড়, এই দুইয়ের মিলনেই এখানকার নবান্নের আনন্দ। বছরের বাকি সময় পাতে থাকে নদী আর বিলের মাছ, সরিষা বাটায় বা আলু-বেগুন দিয়ে সাদামাটা মাছের ঝোল। আরও জানতে দেখুন চুয়াডাঙ্গার বিখ্যাত খাবার।
কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন
ঢাকা থেকে চুয়াডাঙ্গায় যাওয়া যায় সড়ক ও রেলপথ দুভাবেই। খুলনাগামী আন্তঃনগর ট্রেনগুলো চুয়াডাঙ্গা ও দর্শনা হয়ে যায়, আর বাসও নিয়মিত চলে। বেড়ানোর জন্য সবচেয়ে ভালো সময় ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, যখন খেজুর রসের মৌসুম পুরোদমে চলে আর সকালের কুয়াশায় গ্রামগুলো দেখতে সবচেয়ে সুন্দর লাগে।
সাধারণ প্রশ্ন
চুয়াডাঙ্গা কেন বিখ্যাত?
চুয়াডাঙ্গা খেজুর রস ও গুড়, দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানি এবং মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণার ইতিহাসের জন্য পরিচিত।
চুয়াডাঙ্গা কবে জেলা হয়?
ব্রিটিশ আমলে এটি নদীয়া জেলার মহকুমা ছিল, দেশভাগের পর কুষ্টিয়ার অধীনে যায় এবং ১৯৮৪ সালে আলাদা জেলা হয়।
চুয়াডাঙ্গায় খেজুর রস খেতে কখন যাওয়া ভালো?
ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রসের মৌসুম সবচেয়ে জমজমাট থাকে। ভোরবেলা গাছ থেকে নামানো রস পাওয়া যায়, তবে কাঁচা রস খাওয়ার আগে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রাখা ভালো।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh