Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

কক্সবাজার জেলা: সৈকত, পাহাড় আর সাগরের স্বাদ

চট্টগ্রাম বিভাগ · ৮টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. ক্যাপ্টেন কক্সের বাজার
  2. আরাকান, মোগল আর ব্রিটিশ শাসন
  3. সাগর, নদী, পাহাড় আর দ্বীপ
  4. রাখাইন পাড়া, বৌদ্ধ মন্দির আর মহেশখালীর মেলা
  5. সৈকতের বাইরেও কক্সবাজার
  6. লইট্টা ফ্রাই থেকে কোরালের ঝোল
  7. কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন
  8. সাধারণ প্রশ্ন

১৭৯৯ সালের এক বর্ষায় এক ইংরেজ কর্মকর্তা বাঁকখালী নদীর মুখে বসে হিসাব কষছিলেন, আরাকান থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার মানুষকে কোথায় বসত করানো যায়। কাজ শেষ করার আগেই ম্যালেরিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়, কিন্তু তাঁর বসানো ছোট্ট বাজারটির নাম রয়ে যায় চিরকালের জন্য। সেই বাজার থেকেই আজকের কক্সবাজার জেলা, যার নাম শুনলে মানুষের চোখে ভাসে দিগন্তজোড়া বালুকাবেলা আর ঢেউয়ের সারি। তবে সৈকতের বাইরে এই জেলার আরেকটা গভীর পরিচয় আছে: পাহাড়ি বন, লবণের মাঠ, শুঁটকির মাচা, রাখাইন পাড়ার বৌদ্ধ মন্দির আর দ্বীপের জেলেজীবন।

ক্যাপ্টেন কক্সের বাজার

এই অঞ্চলের পুরোনো নাম ছিল পালংকি, আর তারও আগে প্যানোয়া, যার অর্থ হলুদ ফুল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে আরাকান থেকে আসা শরণার্থীদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি এখানে একটি বাজার গড়ে তোলেন, যাকে স্থানীয়রা বলতে থাকে "কক্স সাহেবের বাজার"। সেই নামই ছোট হয়ে কক্সবাজার। নামের এই ইতিহাস তুলনামূলক নথিভুক্ত, তাই অন্য অনেক জেলার মতো এখানে নামের উৎস নিয়ে খুব বেশি লোককাহিনির প্রয়োজন পড়ে না।

আরাকান, মোগল আর ব্রিটিশ শাসন

প্রাচীন কাল থেকেই এই উপকূলে আরব বণিকদের আনাগোনার কথা জানা যায়। দীর্ঘ সময় অঞ্চলটি আরাকান রাজ্যের প্রভাবে ছিল, যার ছাপ আজও রাখাইন জনগোষ্ঠীর ভাষা, স্থাপত্য আর উৎসবে দেখা যায়। ১৬৬৬ সালে মোগলরা চট্টগ্রাম জয় করার পর এই অঞ্চলেও ধীরে ধীরে মোগল প্রভাব ছড়ায়। ব্রিটিশ আমলে ১৮৫৪ সালে কক্সবাজার মহকুমা গঠিত হয় চট্টগ্রাম জেলার অধীনে। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮৪ সালে এটি আলাদা জেলার মর্যাদা পায়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এই জেলাও রক্ষা পায়নি। চকরিয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী মানুষ হত্যা ও ঘরবাড়ি-দোকান পুড়িয়ে দেয়। টেকনাফের ডাকবাংলোয় ক্যাম্প করে রামু, উখিয়া ও টেকনাফ থেকে ধরে আনা বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। জেলায় এসব ঘটনার স্মৃতিতে স্মৃতিস্তম্ভ ও বধ্যভূমি চিহ্নিত আছে।

সাগর, নদী, পাহাড় আর দ্বীপ

কক্সবাজার জেলার পশ্চিম ও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে নাফ নদী, যার ওপারে মিয়ানমার। জেলার সবচেয়ে বড় নদী মাতামুহুরী, যা বান্দরবানের পাহাড় থেকে নেমে চকরিয়া হয়ে সাগরে মিশেছে। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বাঁকখালী। সমুদ্রের পাশেই সবুজ পাহাড়ের সারি, যা উখিয়া-টেকনাফের দিকে আরও ঘন। সাগরের বুকে আছে মহেশখালী, কুতুবদিয়া আর সোনাদিয়ার মতো দ্বীপ, আর দক্ষিণে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন।

উপকূলীয় জেলা হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস এখানকার মানুষের জীবনের এক কঠিন বাস্তবতা। জীবিকার বড় অংশ সাগরনির্ভর: মাছ ধরা, শুঁটকি তৈরি আর লবণ চাষ। শীতের মৌসুমে মহেশখালী ও চকরিয়ার দিকে সাদা লবণের মাঠ চোখে পড়ে, দেশের লবণের বড় জোগান আসে এই অঞ্চল থেকে। চিংড়ি চাষ, পান চাষ আর পর্যটন অর্থনীতির আরও তিনটি বড় স্তম্ভ। মহেশখালীর মিষ্টি পান তো আলাদা করে খ্যাত।

রাখাইন পাড়া, বৌদ্ধ মন্দির আর মহেশখালীর মেলা

কক্সবাজারের মানুষ মূলত চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন, তবে এখানে রাখাইন জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি জেলাকে আলাদা রং দিয়েছে। শহরের রাখাইন পাড়ায় কাঠের কারুকাজ করা বৌদ্ধ ক্যাং, হাতে বোনা কাপড় আর রাখাইন মেয়েদের চালানো দোকান চোখে পড়ে। বৈশাখের সময় রাখাইনদের নববর্ষ উৎসবে পানি ছিটিয়ে একে অপরকে শুভকামনা জানানো হয়, যাকে স্থানীয়ভাবে সাংগ্রাই বা জলকেলি বলে।

রামু উপজেলা বহু পুরোনো বৌদ্ধ বিহার আর মূর্তির জন্য পরিচিত; রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার এর একটি। মহেশখালীর মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় আদিনাথ মন্দির হিন্দুদের তীর্থস্থান, শিবচতুর্দশীতে সেখানে বড় মেলা বসে। একই দ্বীপে মুসলমান, হিন্দু আর বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বসবাস কক্সবাজারের সহাবস্থানের একটা সুন্দর উদাহরণ। খেলার মাঠ থেকে এসেছেন জাতীয় দলের ক্রিকেটার মুমিনুল হক।

সৈকতের বাইরেও কক্সবাজার

  • কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত: প্রায় ১২০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত, বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সৈকতগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।
  • মেরিন ড্রাইভ ও হিমছড়ি: এক পাশে পাহাড়, অন্য পাশে সাগর রেখে চলা সড়ক; হিমছড়িতে পাহাড়ি ঝরনা আর জাতীয় উদ্যান।
  • ইনানী সৈকত: প্রবাল-পাথর ছড়ানো তুলনামূলক শান্ত সৈকত।
  • মহেশখালী: আদিনাথ মন্দির, পান বরজ আর শুঁটকিপল্লী।
  • রামু: পুরোনো বৌদ্ধ বিহার আর রাবার বাগান।
  • সেন্ট মার্টিন দ্বীপ: স্বচ্ছ নীল পানি আর প্রবালের দেশ, যেখানে যাওয়ার নিয়মকানুন সময়ভেদে বদলায়।

লইট্টা ফ্রাই থেকে কোরালের ঝোল

কক্সবাজারে খাবারের টেবিল সাজায় সাগর। সৈকতের পাশের রেস্তোরাঁয় সন্ধ্যায় কাঁচের বাক্সে সাজানো থাকে সেদিনের মাছ; ক্রেতা নিজে বেছে দেন, আর সেটাই মশলা মেখে ভাজা হয়। লইট্টা ফ্রাই এখানকার সবচেয়ে চেনা নাশতা। নরম, প্রায় জেলির মতো লইট্টা মাছ বেসন আর মশলায় মুড়ে মুচমুচে করে ভাজা হয়, ভেতরটা থাকে তুলতুলে। রূপচাঁদা ফ্রাই আরও বিলাসী পদ; চ্যাপ্টা রুপালি মাছটি গোটা ভেজে লেবু আর পেঁয়াজ দিয়ে পরিবেশন করা হয়।

কোরাল মাছ, যাকে অনেকে ভেটকি নামেও চেনেন, এখানে ভুনা, ঝোল কিংবা গ্রিল সবভাবেই রাঁধা হয়। আর শুঁটকি তো কক্সবাজারের গর্ব। নাজিরারটেক বা মহেশখালীর শুঁটকিপল্লীতে বাঁশের মাচায় হাজার হাজার মাছ রোদে শুকাতে দেওয়া হয়; সেখান থেকে লইট্টা, ছুরি, রূপচাঁদা আর চিংড়ি শুঁটকি যায় দেশের নানা প্রান্তে। স্থানীয় ঘরে শুঁটকি ভুনা হয় প্রচুর রসুন আর মরিচ দিয়ে, আর রাখাইন রান্নায় মাছের পেস্টের ব্যবহারও চোখে পড়ে। সৈকতের ধারে হাঁটতে হাঁটতে আরেকটা স্বাদ মিলবে: ভ্যানে করে বিক্রি হওয়া কাঁকড়া ভাজা আর চিংড়ির বড়া, যা লেবু চিপে গরম গরম খাওয়া হয়। বাজারে গেলে দেখা যায় রাখাইন দোকানে বিক্রি হচ্ছে নানা রকম আচার আর বার্মিজ ধাঁচের শুকনো খাবার। সকালে জেলেঘাটে নৌকা ভিড়লে টাটকা মাছ কেনার যে হুড়োহুড়ি, তা দেখাও কক্সবাজারের অভিজ্ঞতার অংশ। জেলার রেস্তোরাঁ আর খাবারের হদিস পাবেন কক্সবাজারের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন

ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার জন্য সড়কপথে সরাসরি বাস চলে, আর ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ চালু হওয়ায় ট্রেনেও যাওয়া যায়। সময় বাঁচাতে অনেকে বিমানে কক্সবাজার বিমানবন্দরে নামেন। ঘোরার জন্য সবচেয়ে ভালো সময় নভেম্বর থেকে মার্চ, যখন সাগর শান্ত আর আকাশ পরিষ্কার। বর্ষায় সাগর উত্তাল থাকে, সেই সময় সৈকতে নামার আগে সতর্কসংকেত ও লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।

সাধারণ প্রশ্ন

কক্সবাজার নামটি কোথা থেকে এসেছে?

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স আঠারো শতকের শেষে এখানে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। "কক্স সাহেবের বাজার" থেকেই নাম হয় কক্সবাজার।

কক্সবাজারে কোন মাছের খাবার বেশি জনপ্রিয়?

লইট্টা ফ্রাই, রূপচাঁদা ফ্রাই আর কোরাল মাছ এখানকার রেস্তোরাঁর সবচেয়ে পরিচিত পদ। শুঁটকি ভুনাও স্থানীয়দের খুব প্রিয়।

কক্সবাজার ঘোরার সেরা সময় কখন?

নভেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে আবহাওয়া সবচেয়ে আরামদায়ক এবং সাগর শান্ত থাকে। এই সময়ে সেন্ট মার্টিনসহ আশপাশের দ্বীপেও যাওয়া তুলনামূলক সহজ।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

কক্সবাজারের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ কক্সবাজারের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 চট্টগ্রাম বিভাগের অন্য জেলা