কুমিল্লা জেলা: ময়নামতি, খদ্দর আর রসমালাই
চট্টগ্রাম বিভাগ · ১৬টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে কুমিল্লা পার হওয়ার সময় বাসে বসে অনেকেই খেয়াল করেন, রাস্তার দুপাশে হঠাৎ লালচে মাটির নিচু টিলা উঁকি দিচ্ছে। এই লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের ভাঁজেই ঘুমিয়ে আছে হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো বৌদ্ধ বিহার, যেখানে একসময় দূরদেশের ভিক্ষুরা পড়তে আসতেন। আবার একই শহরের মিষ্টির দোকানে ঢুকলে মাটির হাঁড়িতে পাওয়া যায় রসমালাই, যার নাম শুনলেই মানুষ কুমিল্লার কথা বলে। কুমিল্লা জেলা এভাবেই প্রাচীন জ্ঞানচর্চা, স্বদেশি তাঁত আর মিষ্টির স্বাদকে একসঙ্গে ধরে রেখেছে।
কমলাঙ্ক থেকে কুমিল্লা
কুমিল্লা নামের উৎস হিসেবে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয় "কমলাঙ্ক" শব্দটি, যার অর্থ পদ্মফুলের দিঘি বা পদ্মের দেশ। প্রচলিত আছে, সপ্তম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ সমতটের কাছে কমলাঙ্ক নামে একটি জনপদের কথা লিখেছিলেন, আর কালের পরিক্রমায় সেই কমলাঙ্কই মুখে মুখে কুমিল্লা হয়ে গেছে। এই ব্যাখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা আছে, তবে স্থানীয়ভাবে এটাই সবচেয়ে প্রচলিত গল্প। ইংরেজ আমলে লেখা হতো কমিল্লা, আর সাম্প্রতিক কালে ইংরেজি বানান বদলে করা হয়েছে কুমিল্লার উচ্চারণের কাছাকাছি।
সমতটের রাজধানী থেকে ত্রিপুরা জেলা
প্রাচীন সমতট জনপদের কেন্দ্র ছিল এই অঞ্চল। সপ্তম থেকে বারো শতকের মধ্যে দেব, খড়্গ, চন্দ্র প্রভৃতি রাজবংশের শাসনের চিহ্ন পাওয়া গেছে লালমাই-ময়নামতির খননে। নালন্দা মহাবিহারের অধ্যক্ষ ও হিউয়েন সাঙের গুরু শীলভদ্র সমতটের মানুষ ছিলেন, আর গবেষকেরা তাঁর জন্মস্থান বর্তমান চান্দিনার আশপাশে বলে মনে করেন।
মধ্যযুগে সমতলভূমি ত্রিপুরার রাজাদের অধীনে ছিল। ১৭৩৩ সালে বাংলার নবাব সুজাউদ্দিন খান এই সমতল অংশ বাংলা সুবার সঙ্গে যুক্ত করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শুরু হলে ১৭৯০ সালে ত্রিপুরা জেলা গঠিত হয় এবং এর সদর দপ্তর হয় কুমিল্লা শহরে। পরে নোয়াখালী আলাদা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর মহকুমা হয়। ১৯৬০ সালে জেলার নাম বদলে রাখা হয় কুমিল্লা, আর ১৯৮৪ সালে চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলাদা জেলা হয়ে যায়।
বিংশ শতকের শুরুতে স্বদেশি আন্দোলনের ঢেউ এখানে নতুন এক শিল্পের জন্ম দেয়। ১৯২১ সালের দিকে অসহযোগ আন্দোলনের সময় হাতে কাটা সুতায় খদ্দর বোনা শুরু হয়, আর কুমিল্লার খাদি একসময় কলকাতা ও বোম্বাই পর্যন্ত পৌঁছেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কুমিল্লা ছিল মিত্রবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি, যার নীরব সাক্ষী ময়নামতি যুদ্ধ সমাধিক্ষেত্র।
মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লা
১৯৭১ সালে কুমিল্লা ছিল ২ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত, যার অধিনায়ক ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ এবং পরে মেজর এ টি এম হায়দার। সীমান্তঘেঁষা জেলা হওয়ায় ভারতের ত্রিপুরা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের যাতায়াত ও প্রশিক্ষণের পথ ছিল এই অঞ্চল দিয়ে। কুমিল্লা সেনানিবাসকে ঘিরে যুদ্ধের শুরুতেই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। সদর, বুড়িচং ও লাকসামসহ জেলার নানা স্থানে বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিত হয়েছে।
গোমতীর পলি, কৃষি আর গ্রাম উন্নয়নের পরীক্ষা
কুমিল্লার প্রাণ গোমতী নদী, যা ত্রিপুরার পাহাড় থেকে নেমে জেলা পার হয়ে মেঘনায় মিশেছে। বর্ষায় এর বন্যা একসময় ভয়ের কারণ ছিল, তাই নদীর দুপাশে উঁচু বাঁধ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমে মেঘনা আর ভেতরে ডাকাতিয়া, তিতাস, সালদার মতো নদী জমিকে উর্বর রেখেছে। ধান, সবজি আর আলুর চাষে জেলাটি সমৃদ্ধ; বুড়িচং ও আশপাশের এলাকার সবজি ঢাকার বাজারে নিয়মিত যায়। বাখরাবাদের গ্যাসক্ষেত্র আর প্রবাসী আয়ও অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে।
কোটবাড়ির পল্লী উন্নয়ন একাডেমি ষাটের দশকে সমবায়ভিত্তিক গ্রাম উন্নয়নের যে পদ্ধতি চালু করেছিল, তা "কুমিল্লা মডেল" নামে বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়। আখতার হামিদ খানের নাম এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
তাঁত, বাঁশি আর গুণী মানুষ
খদ্দর ছাড়াও কুমিল্লার হাতের কাজের ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধ। হোমনার শ্রীমদ্দি গ্রাম বাঁশের বাঁশির জন্য পরিচিত; সেখানে বহু পরিবার প্রজন্ম ধরে বাঁশি বানায়, আর মেলা-পার্বণে সেই বাঁশি ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ময়নামতির শীতলপাটি আর বিজয়পুরের মৃৎশিল্পও এই জেলার চেনা নাম।
সাহিত্য ও সমাজের ইতিহাসেও কুমিল্লার অবদান কম নয়। আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম পুরোধা বুদ্ধদেব বসু কুমিল্লায় জন্মেছিলেন। লাকসামের পশ্চিমগাঁওয়ের নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী নারীশিক্ষার পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণীয়। বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকার মানচিত্রের নকশাকার শিবনারায়ণ দাসও এই জেলার সন্তান। কাজী নজরুল ইসলাম তরুণ বয়সে বারবার কুমিল্লায় এসেছেন; মুরাদনগরের দৌলতপুর আর শহরের কান্দিরপাড়ের সঙ্গে তাঁর জীবনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জড়িয়ে আছে।
লালমাই-ময়নামতির পথে
শালবন বিহার ময়নামতি প্রত্নস্থলের সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শন। বর্গাকার এই বিহারের চারপাশে ভিক্ষুদের কক্ষ আর মাঝখানে মন্দির; খননে পাওয়া মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক আর মূর্তি রাখা আছে পাশের ময়নামতি জাদুঘরে। কাছেই কুটিলা মুড়া, চারপত্র মুড়া আর রূপবান মুড়ার মতো আরও কয়েকটি প্রত্নস্থান। ময়নামতি যুদ্ধ সমাধিক্ষেত্রে সারি সারি সমাধিফলক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের স্মৃতি ধরে রেখেছে। শহরের ধর্মসাগর দিঘির পাড়ে বিকেলের হাওয়া স্থানীয়দের প্রিয় অবসর। লালমাই পাহাড়ের চণ্ডীমুড়া মন্দির থেকে চারপাশের সমতলের দৃশ্যও সুন্দর।
কুমিল্লার রসনা
কুমিল্লার নাম নিলে প্রথমেই আসে রসমালাই। ছোট ছোট ছানার গুটি চিনির রসে জ্বাল দিয়ে তারপর ঘন, হালকা মিষ্টি দুধে ডুবিয়ে রাখা হয়; দুধ এতটাই জ্বাল দেওয়া হয় যে তার রং হয় হালকা হলদেটে। শহরের মনোহরপুর এলাকার পুরোনো মিষ্টির দোকানগুলোর সামনে ভিড় দেখলেই বোঝা যায় এর কদর কতটা। দূরের যাত্রীরাও মহাসড়কে থেমে মাটির হাঁড়িতে রসমালাই কিনে নিয়ে যান।
তবে কুমিল্লার রোজকার খাবার নদী ও খেতের সঙ্গে বাঁধা। গোমতী আর মেঘনার মাছ দিয়ে ঝোল এখানকার দুপুরের সাধারণ চিত্র; টাটকা সবজি দিয়ে রাঁধা পাতলা মাছের ঝোল আর ভাত গ্রামের ঘরে ঘরে চলে। শীতে নতুন চালের গুঁড়ি দিয়ে ভাপা পিঠা, চিতই আর পুলি পিঠা বানানোর ধুম পড়ে, সঙ্গে খেজুরের গুড়। মহাসড়কের পাশের হোটেলগুলোও কুমিল্লার খাদ্যসংস্কৃতির একটা অংশ। ঢাকা-চট্টগ্রাম পথের যাত্রীরা বহু বছর ধরে এখানে থেমে ভাত, ভর্তা আর মাছ খেয়ে আবার রওনা দেন, আর ফেরার পথে হাতে থাকে মিষ্টির হাঁড়ি। শহরের পুরোনো পাড়াগুলোতে বিকেলে চায়ের দোকানে গরম শিঙাড়া আর পুরির আড্ডাও চোখে পড়ে। কোথায় কী খাবেন, তা খুঁজতে দেখুন কুমিল্লার বিখ্যাত খাবার।
ঢাকা থেকে যাত্রা ও ভালো সময়
ঢাকা থেকে কুমিল্লা যাওয়া বেশ সহজ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে বাসে কয়েক ঘণ্টার পথ, আর ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ট্রেনও কুমিল্লা স্টেশনে থামে। প্রত্নস্থল ঘুরে দেখতে হাঁটতে হয় বেশ, তাই শীতকাল, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, সবচেয়ে উপযুক্ত। শীতে পিঠার স্বাদও তখনই পাওয়া যায়।
সাধারণ প্রশ্ন
কুমিল্লার রসমালাই কেন বিখ্যাত?
ঘন জ্বাল দেওয়া দুধে ভেজানো ছোট ছানার গুটির এই মিষ্টি কুমিল্লার পুরোনো মিষ্টির দোকানগুলোর হাত ধরে সারা দেশে জনপ্রিয় হয়েছে। এখানকার রসমালাইয়ের দুধের ঘনত্ব আর হালকা মিষ্টতা আলাদা করে খ্যাত।
শালবন বিহার কোথায়?
শালবন বিহার কুমিল্লা শহরের কাছে কোটবাড়ি এলাকায়, লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের মাঝে। পাশেই ময়নামতি জাদুঘর।
কুমিল্লার খদ্দর কবে থেকে তৈরি হয়?
অসহযোগ আন্দোলনের সময়, মোটামুটি ১৯২১ সালের দিকে, স্বদেশি চেতনায় কুমিল্লায় হাতে বোনা খদ্দরের প্রচলন শুরু হয়। আজও এটি জেলার পরিচিত তাঁতপণ্য।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh