দিনাজপুর জেলা: পোড়ামাটির মন্দির থেকে লিচুবাগান
রংপুর বিভাগ · ১৩টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
জ্যৈষ্ঠের শুরুতে দিনাজপুর শহরের বাজারগুলোতে একটা আলাদা গন্ধ ভাসে। ঝুড়িভর্তি টকটকে লাল লিচু, পাশে বস্তায় সরু দানার সুগন্ধি চাল। অথচ এই একই জেলার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে দেড় হাজার বছরের পুরোনো বৌদ্ধ বিহার, আর মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাংলার পোড়ামাটির শিল্পের সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শনগুলোর একটি। দিনাজপুর তাই শুধু ফলের জেলা নয়; এটি উত্তরবঙ্গের ইতিহাসের এক বড় ভান্ডার, যেখানে রাজা, কৃষক আর কারিগর তিনজনেরই ছাপ স্পষ্ট।
দিনাজপুর নামের পেছনের গল্প
নামটা নিয়ে কোনো লিখিত দলিল নেই, তবে প্রচলিত আছে যে দিনাজ বা দিনরাজ নামে এক ব্যক্তি এখানকার রাজবংশের গোড়াপত্তন করেছিলেন। তাঁর নাম থেকে রাজবাড়ির কাছের একটি মৌজার নাম হয় দিনাজপুর। পরে ইংরেজরা যখন এখানে জেলা গড়ে, তখন রাজার পরিচিত এই নামটিকেই জেলার নাম হিসেবে বেছে নেয়। ইংরেজ আমলের আগে এই অঞ্চলের প্রশাসনিক পরিচয় ছিল ঘোড়াঘাট নামে; সেই ঘোড়াঘাট আজ জেলার একটি উপজেলা।
পুণ্ড্রবর্ধন থেকে ইংরেজ জেলা
প্রাচীনকালে এই ভূখণ্ড ছিল পুণ্ড্রবর্ধনের অংশ। গুপ্ত ও পাল আমলের তাম্রশাসনে কোটিবর্ষ আর পঞ্চনগরী নামে যে প্রশাসনিক এককের কথা পাওয়া যায়, সেগুলোর সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগ আছে বলে ইতিহাসবিদেরা মনে করেন। সদর থেকে কিছুটা দক্ষিণে দেবকোট ছিল লখনৌতি বা গৌড় রাজ্যের একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র; বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনাপর্বের ইতিহাসে দেবকোটের নাম বারবার আসে।
অষ্টাদশ শতকে দিনাজপুর রাজবংশ ছিল প্রবল প্রতাপশালী। মহারাজা প্রাণনাথ আর তাঁর ছেলে রাজা রামনাথের সময়েই তৈরি হয় জেলার দুই প্রধান কীর্তি, কান্তজীর মন্দির আর রামসাগর। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের পর অঞ্চলটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে যায়, আর ১৭৮৬ সালে ইংরেজরা দিনাজপুর জেলা গঠন করে, পুরোনো ঘোড়াঘাটকেও তার সঙ্গে জুড়ে দেয়। একসময় এটি ছিল অবিভক্ত বাংলার সবচেয়ে বড় জেলাগুলোর একটি; উনিশ শতক জুড়ে এর সীমানা বহুবার ভাঙাগড়া হয়েছে। ১৯৪৭ সালে জেলার বড় একটা অংশ পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়, আর ১৯৮৪ সালে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় আলাদা জেলা হলে আজকের দিনাজপুর তার বর্তমান রূপ পায়।
বিশ শতকের চল্লিশের দশকে বর্গাচাষিদের তেভাগা আন্দোলনে দিনাজপুর ছিল উত্তাল। এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হাজী মোহাম্মদ দানেশের জন্ম দিনাজপুরের সুলতানপুর গ্রামে; তাঁর নামে জেলায় একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে।
একাত্তরের দিনাজপুর
মুক্তিযুদ্ধে জেলাটি ছিল ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে। যুদ্ধের একেবারে শুরুতে, মার্চের শেষ সপ্তাহে ফুলবাড়ীতে মুক্তিকামী মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর গাড়িবহর আটকে অস্ত্র ও রসদ ছিনিয়ে নেয়। এরপর পার্বতীপুর, নবাবগঞ্জ, বিরল, হাকিমপুরসহ নানা জায়গায় গণহত্যা চালানো হয়, আবার বীরগঞ্জের ভাতগাঁও সেতুর কাছে কিংবা বিরামপুরে মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা আঘাতও হানেন। জেলায় একাধিক গণকবর ও বধ্যভূমি চিহ্নিত হয়েছে, সেসব জায়গায় স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে।
নদী, মাটি আর মাটির নিচের সম্পদ
দিনাজপুরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে পুনর্ভবা, আত্রাই, ঢেপা, টাঙ্গন আর ছোট যমুনার মতো নদী। বরেন্দ্রভূমির লালচে উঁচু মাটি আর নদীঘেঁষা পলিমাটি মিলে এখানে চাষবাস খুব উর্বর; জেলার বেশির ভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর। ধান এখানে প্রধান ফসল, আর তার মধ্যে কাটারিভোগ ও কালিজিরা চালের নাম দেশজোড়া। আম, লিচু আর সবজির বাগানও চোখে পড়ে সর্বত্র।
তবে দিনাজপুরের আরেক পরিচয় খনিজ সম্পদে। পার্বতীপুরের বড়পুকুরিয়ায় দেশের একমাত্র চালু কয়লাখনি, যার কয়লা দিয়ে পাশের বিদ্যুৎকেন্দ্র চলে। ফুলবাড়ী ও দীঘিপাড়াতেও কয়লার মজুদ আছে; ফুলবাড়ীতে খোলামুখ খনির পরিকল্পনা স্থানীয় মানুষের প্রতিবাদে ২০০৬ সালে থেমে যায়। হাকিমপুরে লোহার খনিজের সন্ধানও পাওয়া গেছে।
দিনাজপুরে যা দেখতেই হয়
- কান্তজীর মন্দির: কাহারোলের কান্তনগরে ঢেপা নদীর ধারে এই নবরত্ন মন্দিরের কাজ শুরু করেন মহারাজা প্রাণনাথ, শেষ করেন রাজা রামনাথ ১৭৫২ সালে। দেয়ালের প্রতিটি ইঞ্চি পোড়ামাটির ফলকে মোড়া, যেখানে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি থেকে শুরু করে শিকার, নৌকাযাত্রা আর সে সময়ের সাধারণ মানুষের জীবন খোদাই করা। এর নয়টি চূড়া ছিল, যেগুলো ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে।
- নয়াবাদ মসজিদ: কান্তজীর মন্দির থেকে খুব দূরে নয়, ঢেপার তীরেই তিন গম্বুজের এই মসজিদ। শিলালিপি অনুযায়ী ১৭৯৩ সালে নির্মিত, দেয়ালে পোড়ামাটির লতাপাতার নকশা। প্রচলিত আছে, মন্দির গড়তে আসা মুসলমান কারিগরেরা নিজেদের নামাজের জন্য এটি তৈরি করেছিলেন।
- রামসাগর: শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণে তেজপুরে রাজা রামনাথের খনন করা বিশাল দিঘি, উত্তর-দক্ষিণে এক কিলোমিটারেরও বেশি লম্বা। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি খরা-দুর্ভিক্ষের সময় এটি খোঁড়া হয় বলে জানা যায়। পাড়ের গাছপালা আর শান্ত জল মিলিয়ে এটি এখন জেলার সবচেয়ে প্রিয় বেড়ানোর জায়গা।
- সীতাকোট বিহার: নবাবগঞ্জে প্রায় বর্গাকার এক বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ, চারদিকে সারি সারি ভিক্ষু-কক্ষ। এখানে পাওয়া দুটি ব্রোঞ্জের বোধিসত্ত্ব মূর্তির আদলে বিহারটিকে সপ্তম-অষ্টম শতকের বলে ধরা হয়।
- দিনাজপুর রাজবাড়ি ও সুখসাগর-মাতাসাগর: শহরের উত্তর-পূর্বে রাজবংশের বসতবাড়ির জীর্ণ কাঠামো, আশপাশে রাজাদের কাটানো দিঘিগুলো আজও টিকে আছে।
মানুষ, গান আর ঈদের মাঠ
দিনাজপুরের লোকসংস্কৃতিতে ভাওয়াইয়া গানের টান স্পষ্ট, সঙ্গে আছে কীর্তন, পাঁচালি, বাউল, জারি আর মেয়েলি গীত। চৈত্রের শেষে গ্রামে গ্রামে চড়ক উৎসব হয়। জেলায় সাঁওতাল, ওরাওঁসহ বেশ কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস, তাদের নিজস্ব উৎসব আর নাচগানও এই অঞ্চলের রঙে যোগ করেছে। দিনাজপুর শহরের গোর-এ-শহীদ ঈদগাহ মাঠে ঈদের জামাতে বিপুল মানুষের সমাগম হয়, যা এখন জেলার পরিচয়ের অংশ। খেলার জগতে জাতীয় ক্রিকেট দলের লিটন দাসও এই জেলার সন্তান।
লিচু, কাটারিভোগ আর শীতের পিঠা
দিনাজপুরের খাবারের কথা উঠলে প্রথমেই আসে লিচু। মাশিমপুরের বেদানা লিচু ছোট বিচি আর রসালো শাঁসের জন্য বিখ্যাত, সঙ্গে আছে বোম্বাই আর চায়না জাতের লিচু। মে মাসের শেষ থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাগান থেকে সরাসরি পাড়া লিচু খাওয়ার অভিজ্ঞতা এখানে আলাদা।
লিচুর পরেই চালের কথা। কাটারিভোগ চালের সরু, সুগন্ধি দানা দিনাজপুরের ঘরে ঘরে পোলাওয়ের ভিত্তি। বিয়ে, দাওয়াত কিংবা ঈদে এই চালের পোলাও আর মাংস এখানে প্রায় অবধারিত। শীতে আবার রান্নাঘরের চেহারা বদলে যায়; নতুন ধানের চালের গুঁড়া দিয়ে ভাপা, চিতই আর দুধে ভেজানো নানা পিঠা তৈরি হয়, সঙ্গে খেজুর গুড়। জেলার খাবারের আরও খোঁজ পাবেন দিনাজপুরের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাওয়ার পথ ও সময়
ঢাকা থেকে সড়কপথে যমুনা সেতু পেরিয়ে বাসে দিনাজপুর যাওয়া যায়, রেলপথেও সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চলে। দ্রুত যেতে চাইলে আকাশপথে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নেমে সড়কপথে অল্প সময়েই দিনাজপুর পৌঁছানো যায়। ঘুরে দেখার জন্য শীতকাল সবচেয়ে আরামদায়ক, আর লিচুর স্বাদ নিতে চাইলে যেতে হবে জ্যৈষ্ঠ মাসে।
সাধারণ প্রশ্ন
দিনাজপুর কেন বিখ্যাত?
দিনাজপুর কান্তজীর মন্দির, রামসাগর দিঘি আর বেদানা লিচুর জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। কাটারিভোগ চাল আর বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিও জেলার বড় পরিচয়।
কান্তজীর মন্দির কবে তৈরি হয়?
মহারাজা প্রাণনাথ মন্দিরের কাজ শুরু করেন, আর তাঁর ছেলে রাজা রামনাথ ১৭৫২ সালে তা শেষ করেন। মন্দিরের নয়টি চূড়া ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়।
দিনাজপুরের লিচু কখন পাওয়া যায়?
সাধারণত মে মাসের শেষ থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত লিচুর মৌসুম চলে। এ সময় বাগান ও বাজার দুই জায়গাতেই টাটকা লিচু মেলে।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh