Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

গাইবান্ধা জেলা: নদীভাঙা মানুষের দেশ আর রসমঞ্জরীর শহর

রংপুর বিভাগ · ৭টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. নামের ভেতরে এক মহাকাব্য
  2. মৌর্য থেকে মহকুমা
  3. একাত্তরে প্রতিরোধ
  4. চর, নদী আর হাতের কাজ
  5. গান, মানুষ আর সাহিত্য
  6. ঘুরে দেখার জায়গা
  7. রসমঞ্জরী আর চরের রান্নাঘর
  8. কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন
  9. সাধারণ প্রশ্ন

গাইবান্ধা শহরের জন্মই একটি নদীভাঙনের গল্প। উনিশ শতকের মাঝামাঝি এই মহকুমার সদর দপ্তর ছিল ভবানীগঞ্জে, নদীর পাড়ের এক ব্যস্ত জনপদে। কিন্তু ১৮৭৫ সালের দিকে নদী সেই ভবানীগঞ্জকে গিলে ফেলে, আর দপ্তর সরিয়ে আনা হয় গাইবান্ধায়। সেই থেকে নদী আর মানুষের টানাপোড়েনই এই জেলার জীবনের মূল সুর। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা আর তিস্তার জলে গড়া চর, বছর বছর বদলে যাওয়া মানচিত্র আর তার মধ্যেই টিকে থাকা কৃষক-জেলের সংসার নিয়ে গাইবান্ধা রংপুর বিভাগের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দাঁড়িয়ে আছে।

নামের ভেতরে এক মহাকাব্য

গাইবান্ধা নামটা শুনলেই "গাই" আর "বান্ধা" শব্দ দুটো আলাদা করে কানে বাজে, আর স্থানীয় কিংবদন্তিও ঠিক সেই পথেই হেঁটেছে। প্রচলিত আছে, মহাভারতের বিরাট রাজার রাজধানী ছিল আজকের গোবিন্দগঞ্জে, আর তাঁর হাজার হাজার গাভী যে জায়গায় বেঁধে রাখা হতো, সেখান থেকেই নাম হয় গাইবান্ধা। এ কাহিনির ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, তবে গোবিন্দগঞ্জে "বিরাট রাজার বাড়ি" নামে পরিচিত একটি প্রাচীন ঢিবি আজও মানুষ দেখতে যায়, যা কিংবদন্তিটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

মৌর্য থেকে মহকুমা

প্রাচীনকালে অঞ্চলটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মৌর্য, গুপ্ত, পাল আর কামরূপ রাজ্যের অধীনে ছিল বলে ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেন। মধ্যযুগে এখানে ইসলাম প্রচারকদের আগমন ঘটে; সদরের মীরের বাগানে শাহ সুলতান গাজীর নামে পরিচিত প্রাচীন মসজিদটি সেই সময়ের স্মৃতি বহন করে।

ইংরেজ আমলে বৃহত্তর রংপুর জেলার অংশ হিসেবে ১৮৫৮ সালে ভবানীগঞ্জ মহকুমা গঠিত হয়। নদীভাঙনের পর সদর সরে আসে গাইবান্ধায়, আর ১৯২৩ সালে গাইবান্ধা শহর পৌরসভার মর্যাদা পায়। অতিরিক্ত খাজনার বিরুদ্ধে অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকের কৃষক প্রতিরোধ থেকে শুরু করে বিশ শতকের তেভাগা আন্দোলন পর্যন্ত এই অঞ্চলের কৃষক বারবার নিজেদের অধিকারের জন্য রুখে দাঁড়িয়েছে। ১৯৪৯ সালে হাটের তোলা আদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ফয়েজউদ্দিন ও পুতি শেখ। ১৯৫৬ সালে ফুলছড়িতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে একটি কৃষক সম্মেলনও হয়েছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৮৪ সালে গাইবান্ধা পূর্ণাঙ্গ জেলা হয়।

একাত্তরে প্রতিরোধ

মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে পলাশবাড়ীর মানুষ রংপুর-বগুড়া সড়ক অবরোধ করে। ২৭ মার্চ গোবিন্দগঞ্জে কাটাখালী সেতু উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টায় থাকা কয়েকজন ছাত্র পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। এপ্রিলে রংপুরের পীরগঞ্জ আর সাদুল্লাপুর সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘর্ষে বেশ কিছু পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। ত্রিমোহনী ঘাটের যুদ্ধও স্থানীয় স্মৃতিতে বিশেষ জায়গা নিয়ে আছে। জেলার কয়েকটি জায়গায় গণকবরের সন্ধান মিলেছে, আর গড়ে উঠেছে একাধিক স্মৃতিস্তম্ভ।

চর, নদী আর হাতের কাজ

গাইবান্ধার পূর্ব সীমা দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, উত্তরে তিস্তা, আর ভেতর দিয়ে করতোয়া, ঘাঘট ও বাঙালী নদী। সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি আর সাঘাটার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে মানুষ বন্যা আর ভাঙনের সঙ্গে প্রায় প্রতিবছরই লড়াই করে। তবু এই পলিমাটিতে ধান, পাট, ভুট্টা, মরিচ আর বাদামের ফলন ভালো, তাই জেলার বেশির ভাগ মানুষ কৃষিজীবী।

কৃষির বাইরে গাইবান্ধার একটি চমকপ্রদ পরিচয় আছে গোবিন্দগঞ্জের কোচাশহরে। ষাটের দশক থেকে এখানকার ঘরে ঘরে সোয়েটার, মোজা আর মাফলার বোনা হয়; শীত এলেই এই কুটিরশিল্পের পণ্য সারা দেশের বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। হাতে চালানো ছোট বুনন-যন্ত্রের খটখট শব্দ অনেক বাড়ির উঠানে সারা বছরই শোনা যায়, আর নারী-পুরুষ মিলেই এই কাজে যুক্ত।

চরের জীবন বাইরে থেকে যতটা কঠিন মনে হয়, ভেতরে ততটাই সংগঠিত। বন্যার পানি থেকে বাঁচতে বাড়িগুলো উঁচু মাটির ভিটার ওপর তোলা হয়, গবাদিপশুর জন্যও থাকে আলাদা উঁচু জায়গা। যাতায়াতের প্রধান ভরসা ইঞ্জিনচালিত নৌকা, শুকনো মৌসুমে বালুর ওপর দিয়ে ঘোড়ার গাড়িও চলে। নদী সরে গেলে নতুন চর জাগে, আর মানুষ সেখানে আবার নতুন করে বসতি গড়ে। একসময় বালাসী ঘাট থেকে যমুনার ওপারে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাটে ফেরি চলত, যা ছিল উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগের অন্যতম পথ; যমুনা সেতু চালুর পর সেই পথের গুরুত্ব অনেকটা কমে গেছে।

গান, মানুষ আর সাহিত্য

গাইবান্ধার গ্রামে ভাওয়াইয়া আর পল্লিগীতির টান যেমন আছে, তেমনি আছে জারি, সারি আর বিয়ের গান। সাঁওতাল ও ওরাওঁ জনগোষ্ঠীর মানুষ জন্ম, বিয়ে বা শোকের নিজস্ব গান-নাচ আজও ধরে রেখেছেন।

বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ১৯৪৩ সালে গাইবান্ধার গোটিয়া গ্রামে মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। "চিলেকোঠার সেপাই" আর "খোয়াবনামা"-র লেখকের শৈশবের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের এই নদী-চরের দুনিয়া জড়িয়ে আছে।

ঘুরে দেখার জায়গা

ফুলছড়ির বালাসী ঘাট ব্রহ্মপুত্রের ধারে বসে নদী দেখার জন্য জনপ্রিয়; এখান থেকে নৌকায় চরের জীবন দেখতে যাওয়া যায়। গোবিন্দগঞ্জে বিরাট রাজার বাড়ির ঢিবি আর সতেরো শতকের বর্ধনকুঠি ইতিহাসপ্রেমীদের টানে। সাদুল্লাপুরের নলডাঙ্গা জমিদারবাড়ি আর শাহ জামালের মাজারও দেখার মতো। নদীঘেঁষা জীবনের ছবি দেখতে চাইলে ফুলছড়ির দিকে একটি দিন রেখে দেওয়াই ভালো। শীতের বিকেলে বালাসী ঘাটে নদীর ওপর সূর্য ডোবার দৃশ্য, জেলেদের নৌকা আর চরের দিকে ফিরতে থাকা যাত্রীদের ভিড় মিলিয়ে জায়গাটি এক অন্যরকম প্রাণ পায়।

রসমঞ্জরী আর চরের রান্নাঘর

গাইবান্ধার নাম শুনলে দেশের অনেকের মুখে প্রথম যে শব্দটি আসে, তা হলো রসমঞ্জরী। ছানার ছোট ছোট গুটি ঘন, জ্বাল দেওয়া ক্ষীরের মধ্যে ডুবিয়ে তৈরি হয় এই মিষ্টি; দেখতে অনেকটা রসমালাইয়ের মতো হলেও এর ক্ষীর আরও ঘন, স্বাদে আলাদা। প্রচলিত তথ্যমতে, গত শতকের মাঝামাঝি শহরের রমেশ ঘোষ নামে এক মিষ্টি ব্যবসায়ী প্রথম এটি তৈরি করেন, পরে তা গাইবান্ধার পরিচয় হয়ে ওঠে। আজও শহরের মিষ্টির দোকানগুলোতে মাটির পাত্রে বা প্লাস্টিকের বাক্সে রসমঞ্জরী কিনে নিয়ে যাওয়া ভ্রমণকারীদের অভ্যাস।

মিষ্টির বাইরে গাইবান্ধার সাধারণ রান্নাঘর নদীর মাছেই চলে। ব্রহ্মপুত্র আর তিস্তার পাঙাশ, বোয়াল, আইড় কিংবা বিলের ছোট মাছ দিয়ে হালকা মসলার মাছের ঝোল এখানকার দুপুরের খাবারের প্রধান পদ। শীতে নতুন চালের ভাপা পিঠা, চিতই আর দুধ-চিতই রান্না হয় প্রায় প্রতিটি বাড়িতে। এসব খাবারের বিস্তারিত দেখুন গাইবান্ধার বিখ্যাত খাবার পাতায়।

কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন

ঢাকা থেকে সড়কপথে যমুনা সেতু ও বগুড়া হয়ে বাসে গাইবান্ধা যাওয়া সবচেয়ে প্রচলিত। জেলাটি রেলপথেও যুক্ত, আর আকাশপথে গেলে নিকটতম বিমানবন্দর সৈয়দপুর। নদী আর চর দেখতে চাইলে বর্ষার পরে, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে যাওয়াই ভালো; তখন পানি নেমে যায়, পথঘাটও শুকনো থাকে।

সাধারণ প্রশ্ন

গাইবান্ধা নামের উৎপত্তি কী?

প্রচলিত আছে, মহাভারতের বিরাট রাজার গাভীগুলো এখানে বেঁধে রাখা হতো, সেখান থেকেই নাম গাইবান্ধা। এটি কিংবদন্তি, ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়।

রসমঞ্জরী কী দিয়ে তৈরি?

ছানার ছোট গুটি ঘন করে জ্বাল দেওয়া দুধের ক্ষীরে ডুবিয়ে রসমঞ্জরী তৈরি হয়। এটি গাইবান্ধার সবচেয়ে পরিচিত মিষ্টি।

গাইবান্ধা কবে জেলা হয়?

গাইবান্ধা ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়। এর আগে এটি বৃহত্তর রংপুর জেলার একটি মহকুমা ছিল।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

গাইবান্ধার খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ গাইবান্ধার খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 রংপুর বিভাগের অন্য জেলা