গাজীপুর জেলা: শালবন, কারখানা আর কাঁঠালের দেশ
ঢাকা বিভাগ · ৫টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
শ্রীপুরের জৈনাবাজারে আষাঢ়ের ভোরে গেলে দেখা যায়, ভ্যান, পিকআপ আর মাথায় ঝুড়ি নিয়ে হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছেন একটাই ফলের জন্য, কাঁঠাল। লাল মাটির টিলা, শালগাছের সারি আর তার ফাঁকে ফাঁকে কাঁঠাল বাগান, এটাই গাজীপুর জেলার পুরোনো চেহারা। অথচ মহাসড়কের ধারে চোখ ফেরালে দেখা যাবে সারি সারি পোশাক কারখানা, শ্রমিকের ভিড় আর ব্যস্ত শিল্পনগর। ঢাকার উত্তরে লাগোয়া এই জেলা তাই একসঙ্গে বনভূমির শান্তি আর শিল্পের কোলাহল বহন করে।
গাজীর নামে জনপদ
গাজীপুর নামের উৎস নিয়ে দুটি গল্প প্রচলিত আছে। একটি মত অনুযায়ী, দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের সময়ে পালোয়ান গাজী নামে এক বীর এই অঞ্চলে বসতি গড়েছিলেন, তাঁর নাম থেকেই জায়গার নাম। আরেকটি মত বলে, বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম ঈশা খাঁর সময়ের এক সেনানায়ক ফজল গাজীর নামে এলাকার নাম হয়েছে। মধ্যযুগে ভাওয়াল অঞ্চলে গাজী পরিবারের প্রভাবের কথা নানা লোককথায় শোনা যায়, তবে নামকরণের কোনো নির্দিষ্ট দলিল পাওয়া যায় না। জেলা সদরের পুরোনো নাম জয়দেবপুর, যা এখনো রেলস্টেশন আর চৌরাস্তার নামে টিকে আছে।
ভাওয়ালের জমিদারি ও সন্ন্যাসী রাজার গল্প
গাজীপুরের ইতিহাস বলতে গেলেই ভাওয়াল পরগনার কথা আসে। ব্রিটিশ আমলে ভাওয়াল জমিদারি ছিল ঢাকা অঞ্চলের অন্যতম বড় জমিদারি, আর জয়দেবপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ি ছিল তার কেন্দ্র। এই রাজবাড়িকে ঘিরে বিংশ শতকের গোড়ায় জন্ম নেয় উপমহাদেশের সবচেয়ে আলোচিত মামলাগুলোর একটি, ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা।
গল্পটা এমন: জমিদার পরিবারের মেজো কুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায় দার্জিলিংয়ে মারা গেছেন বলে খবর আসে। প্রায় এক যুগ পর এক সন্ন্যাসী ঢাকায় হাজির হন, আর অনেকে তাঁকে সেই হারিয়ে যাওয়া কুমার বলে শনাক্ত করেন। কুমারের স্ত্রী তাঁকে প্রতারক বলেন, অথচ তাঁর বোন তাঁকে ভাই বলে মেনে নেন। ঢাকা, কলকাতা হয়ে মামলা গড়ায় লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত, আর বছরের পর বছর ধরে সংবাদপত্রে এর বিবরণ ছাপা হয়। এই কাহিনি নিয়ে পরে উপন্যাস ও চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে। আজ ভাওয়াল রাজবাড়িতে সরকারি দপ্তর বসে, কিন্তু পুরোনো ভবনের বারান্দা আর দিঘি সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
জয়দেবপুর থেকে একাত্তর
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গাজীপুরের একটি বিশেষ জায়গা আছে। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ, যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগেই, জয়দেবপুরে পাকিস্তানি সেনাদের অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ব্যারিকেড গড়ে তোলেন। সেনাদের গুলিতে জয়দেবপুর ও চান্দনা চৌরাস্তায় কয়েকজন নিহত হন। দিনটিকে স্থানীয়ভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রথম দিকের ঘটনা হিসেবে স্মরণ করা হয়। জয়দেবপুর চৌরাস্তার ভাস্কর্য ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ সেই সাহসের স্মারক।
যুদ্ধের মাসগুলোতে টঙ্গী, জয়দেবপুর ও শ্রীপুরে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা চালায়, আর মুক্তিযোদ্ধারা নানা জায়গায় পাল্টা আক্রমণ করেন। অক্টোবরে কাচিঘাটার যুদ্ধ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এই জেলারই কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে জন্মেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, যিনি একাত্তরে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যুদ্ধকালীন সরকার পরিচালনা করেন।
১৯৮৪ সালে ঢাকা জেলা থেকে আলাদা হয়ে গাজীপুর স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা পায়। এর পাঁচটি উপজেলা হলো গাজীপুর সদর, শ্রীপুর, কাপাসিয়া, কালিয়াকৈর ও কালীগঞ্জ।
লাল মাটি, শালবন আর নদী
গাজীপুরের মাটি মধুপুর গড়ের অংশ, তাই এখানকার জমি আশপাশের নিচু সমভূমির চেয়ে একটু উঁচু, রং লালচে। এই উঁচু জমিতেই একসময় বিস্তৃত ছিল শালবন, যার একটি বড় অংশ আজ ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান হিসেবে সংরক্ষিত। জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে পুরোনো ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বংশী, বালু আর বানার নদী; ছোট খাল আর বিলও আছে অনেক।
একসময় জীবিকার মূল ভিত্তি ছিল কৃষি, এখনো গ্রামাঞ্চলে ধান, সবজি, কাঁঠাল, পেয়ারা আর অন্যান্য ফলের চাষ হয়। তবে গত কয়েক দশকে টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈর আর শ্রীপুরে গড়ে উঠেছে বিপুল পোশাক ও অন্যান্য শিল্পকারখানা। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা শ্রমিকেরা এখানে বসতি গড়েছেন, ফলে জেলাটি এখন বহু অঞ্চলের মানুষের মিলনস্থল।
মানুষ, ধর্মীয় সমাবেশ আর সংস্কৃতি
প্রতি শীতে টঙ্গীতে তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমা হয়, যেখানে দেশ-বিদেশের বিপুল সংখ্যক মুসল্লি জড়ো হন। কালীগঞ্জের নাগরী এলাকায় আছে পুরোনো সেন্ট নিকোলাস গির্জা, যা এ অঞ্চলের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী। কালীগঞ্জের বক্তারপুরে ঈশা খাঁর সমাধি বলে পরিচিত একটি স্থানও আছে। সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে পিরুজালীর নুহাশ পল্লী পরিচিত নাম, প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বাগানবাড়ি, যেখানে তাঁর সমাধিও রয়েছে।
গাজীপুরে ঘোরার জায়গা
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান শালবনের ছায়ায় হাঁটা আর পিকনিকের জন্য জনপ্রিয়। শ্রীপুরে বিশাল এলাকা নিয়ে গড়া সাফারি পার্কে খোলা পরিবেশে বন্যপ্রাণী দেখা যায়। জয়দেবপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ি, চৌরাস্তার জাগ্রত চৌরঙ্গী, নাগরীর গির্জা, কাশিমপুর জমিদারবাড়ি আর নুহাশ পল্লী ঘুরে দেখার মতো। টঙ্গীর কাছে মুঘল আমলের সেতুর স্মৃতিও স্থানীয় ইতিহাসে জায়গা পায়।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ঢুকলে শহরের কোলাহল দ্রুত মিলিয়ে যায়। সোজা উঠে যাওয়া শালগাছের সারি, নিচে শুকনো পাতার স্তর আর মাঝে মাঝে ছোট জলাশয়, এই বনের চেনা ছবি। বসন্তে শালের নতুন পাতা আর ফুলে বন অন্য রকম রং পায়। একসময় এই শালবনে নানা বন্যপ্রাণীর বাস ছিল, এখনো পাখি আর ছোট প্রাণী চোখে পড়ে। শীতকালে ঢাকা থেকে বহু পরিবার আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দল এখানে বনভোজনে আসে। তবে চারপাশে শিল্পায়ন আর বসতির চাপ বাড়ায় বন রক্ষার প্রশ্নটিও এখন গাজীপুরের বড় আলোচনার বিষয়।
কাঁঠালের মৌসুম আর রাস্তার ধারের চা
খাবারের কথা বললে গাজীপুরের প্রথম নাম কাঁঠাল। শ্রীপুর, কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ ও কালিয়াকৈরের উঁচু লাল মাটিতে জন্মানো কাঁঠাল মিষ্টি আর রসালো বলে দেশজুড়ে খ্যাতি আছে; গাজীপুরের কাঁঠাল ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ে পাকা কাঁঠালের কোষ খাওয়া হয় মুড়ি বা দুধ-ভাতের সঙ্গে, আর কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে রান্না হয় তরকারি, যাকে অনেকে গাছপাঁঠা বলেন। ভাজা কাঁঠালের বিচি গ্রামের বিকেলের প্রিয় নাশতা।
গাজীপুরের লাল মাটিতে পেয়ারার বাগানও চোখে পড়ে; বর্ষায় কাঁচা-পাকা পেয়ারা লবণ-মরিচ দিয়ে খাওয়ার মজাই আলাদা। আর শিল্পাঞ্চলের ব্যস্ততার মধ্যে যে জিনিসটি প্রায় প্রতিটি মোড়ে পাওয়া যায়, তা হলো ঘন দুধের চা। কারখানার শিফট বদলের সময় টং দোকানগুলোতে চায়ের কাপ হাতে জটলা গাজীপুরের দৈনন্দিন ছবি। আরও খাবারের খোঁজ মিলবে গাজীপুরের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাতায়াত ও সময়
ঢাকা থেকে গাজীপুর সড়কপথে খুব কাছে; ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে বাসে বা ব্যক্তিগত গাড়িতে যাওয়া যায়। রেলপথে কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে জয়দেবপুর জংশন পর্যন্ত নিয়মিত ট্রেন চলে। শালবনে হাঁটার জন্য শীতকাল আরামদায়ক, তবে কাঁঠালের স্বাদ নিতে চাইলে জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসেই যেতে হবে।
সাধারণ প্রশ্ন
গাজীপুর কবে জেলা হয়?
১৯৮৪ সালে ঢাকা জেলা থেকে আলাদা হয়ে গাজীপুর জেলা গঠিত হয়। এর পাঁচটি উপজেলা হলো সদর, শ্রীপুর, কাপাসিয়া, কালিয়াকৈর ও কালীগঞ্জ।
১৯ মার্চ ১৯৭১ জয়দেবপুরে কী ঘটেছিল?
সেদিন জয়দেবপুরের মানুষ পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং গুলিতে কয়েকজন নিহত হন। জয়দেবপুর চৌরাস্তার জাগ্রত চৌরঙ্গী ভাস্কর্য এই ঘটনার স্মারক।
গাজীপুরের কাঁঠাল কোথায় বেশি পাওয়া যায়?
শ্রীপুর উপজেলা কাঁঠাল উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র, আর সেখানকার জৈনাবাজার জেলার সবচেয়ে বড় কাঁঠালের হাট। মৌসুম জ্যৈষ্ঠ থেকে আষাঢ়।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh