Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

হবিগঞ্জ জেলা: চা-বাগান, হাওর আর ইতিহাসের মোড়

সিলেট বিভাগ · ৮টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. খোয়াই নদীর তীরে এক হাট
  2. সুফি, ভূঁইয়া আর চা-বাগানের ইতিহাস
  3. টিলা থেকে হাওর: দুই রকম হবিগঞ্জ
  4. আখড়া, গান আর মানুষ
  5. দেখার মতো জায়গা
  6. হাওরের থালা, বাগানের চা
  7. যাতায়াত ও উপযুক্ত মৌসুম
  8. সাধারণ প্রশ্ন

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল, চুনারুঘাটের তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের এক ডাকবাংলোয় কয়েকজন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা বৈঠকে বসেছিলেন। সেই বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। চা-বাগানের টিলার মাঝে সেই বাংলোর পাশে আজ স্মৃতিসৌধ দাঁড়িয়ে আছে। হবিগঞ্জ জেলাকে বুঝতে এই জায়গাটা ভালো শুরু: একদিকে চা-বাগানের সবুজ টিলা আর বন, অন্যদিকে নিচু হাওর আর নদী, আর এর মধ্যে বয়ে চলা দীর্ঘ ইতিহাস। সিলেট বিভাগের এই জেলা চা, গ্যাস, ধান আর মাছ মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখে।

খোয়াই নদীর তীরে এক হাট

হবিগঞ্জ নামের পেছনে প্রচলিত গল্পটি একটি হাটকে ঘিরে। প্রচলিত আছে, মধ্যযুগের কবি সৈয়দ সুলতানের বংশধর সৈয়দ হবিব উল্লাহ খোয়াই নদীর তীরে একটি গঞ্জ বা বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নামে বাজারটির নাম হয় হবিবগঞ্জ, আর লোকমুখে তা দাঁড়ায় হবিগঞ্জ। কবি সৈয়দ সুলতানের পারিবারিক বসতি সুলতানশী হাবেলি এখনো জেলা সদরের কাছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।

সুফি, ভূঁইয়া আর চা-বাগানের ইতিহাস

চুনারুঘাটের চাকলাপুঞ্জি এলাকায় পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলে, এই অঞ্চলে মানুষের বসতি অনেক পুরোনো। চৌদ্দ শতকে হযরত শাহজালালের সিলেট বিজয়ের পর তাঁর অনুসারীরা এ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন; তাঁর সেনাপতি হিসেবে পরিচিত সৈয়দ নাসিরউদ্দিনের মাজার চুনারুঘাটে। বারো ভূঁইয়াদের সময়ে এই অঞ্চলের কিছু জমিদার ও দুর্গের কথাও জানা যায়।

ব্রিটিশ আমলে উনিশ শতকের শেষ ভাগে হবিগঞ্জ সিলেট জেলার একটি মহকুমা হয়। একই সময়ে টিলাভূমিতে চা-বাগান গড়ে ওঠে, আর বাগানে কাজ করাতে দূরদূরান্ত থেকে শ্রমিক আনা হয়, যাঁদের উত্তরসূরিরা আজও চা-বাগানে বাস করেন। ১৯৮৪ সালে হবিগঞ্জ পূর্ণাঙ্গ জেলা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকেই তেলিয়াপাড়া বৈঠক হবিগঞ্জকে ইতিহাসে বিশেষ জায়গা দিয়েছে। কর্নেল এম এ জি ওসমানীর উপস্থিতিতে দ্বিতীয় ও চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তারা সেখানে যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে আলোচনা করেন। পরে নভেম্বরে আজমিরীগঞ্জে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস শহীদ হন, যিনি ভাটি অঞ্চলে দুঃসাহসী অভিযানের জন্য পরিচিত ছিলেন।

টিলা থেকে হাওর: দুই রকম হবিগঞ্জ

হবিগঞ্জের পূর্ব ও দক্ষিণে, ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত ঘেঁষে চুনারুঘাট, মাধবপুর ও বাহুবলে উঁচু টিলা, চা-বাগান আর মিশ্র চিরসবুজ বন। পশ্চিম ও উত্তরে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই আর নবীগঞ্জের দিকে বিস্তীর্ণ নিচু হাওর, যা বর্ষায় সাগরের মতো আর শীতে বোরো ধানের মাঠ। খোয়াই, কুশিয়ারা, কালনী, সুতাং ও করাঙ্গী জেলার প্রধান নদী।

হাওরের গ্রামগুলোতে বর্ষা মানে নৌকা আর ঢেউ। উঁচু ভিটার ওপর ঘনবসতি, চারপাশে পানি, আর এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। শুকনো মৌসুমে সেই পানি সরে গেলে বেরিয়ে আসে বিল, যেখানে মাছ ধরার মৌসুম শুরু হয়, আর বিস্তীর্ণ মাঠে চলে বোরো ধানের চারা রোপণ।

এই বৈচিত্র্যই জীবিকার বৈচিত্র্য তৈরি করেছে। হাওরে ধান আর মাছ, টিলায় চা ও রাবার বাগান, আর মাটির নিচে প্রাকৃতিক গ্যাস। নবীগঞ্জের বিবিয়ানা, রশিদপুর ও হবিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্র দেশের জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ, আর মাধবপুরের শাহজীবাজারে আছে বিদ্যুৎকেন্দ্র। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিল্পকারখানাও গড়ে উঠছে।

আখড়া, গান আর মানুষ

হবিগঞ্জের লোকসংগীতে হাওরের ছাপ স্পষ্ট; ভাটিয়ালি, ধামাইল আর মরমি গান এখানকার বিয়ে, উৎসব আর নৌকাবাইচের সঙ্গী। হবিগঞ্জে বৈষ্ণব ঐতিহ্যও বেশ গভীর। বানিয়াচংয়ের বিথঙ্গল আখড়া একটি পুরোনো বৈষ্ণব তীর্থ, যেখানে উৎসবের সময় দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন। চুনারুঘাট অঞ্চলে মণিপুরি ও খাসিয়া সম্প্রদায়ের বসতি আছে, আর চা-বাগানের শ্রমিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, উৎসব ও নাচগান জেলার সংস্কৃতিতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

বানিয়াচংকে প্রচলিতভাবে এশিয়ার অন্যতম বড় গ্রাম বলা হয়। এখানকার সাগরদিঘি নিয়ে কমলা রানির আত্মত্যাগের লোককাহিনি প্রচলিত, যা অঞ্চলের গানে ও গল্পে ফিরে ফিরে আসে। এই জেলা থেকে উঠে এসেছেন স্বদেশি আন্দোলনের নেতা বিপিনচন্দ্র পাল, গণসংগীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ।

দেখার মতো জায়গা

চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান হবিগঞ্জের সবচেয়ে পরিচিত গন্তব্য; বনের ভেতর হাঁটাপথ, উঁচু গাছ, পাখি আর বানরের ডাক। কাছেই তেলিয়াপাড়া চা-বাগান ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ। চুনারুঘাটেরই আরেক প্রান্তে রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, দেশের বড় প্রাকৃতিক বনগুলোর একটি। ইতিহাসপ্রেমীরা যেতে পারেন উচাইলের শংকরপাশা শাহী মসজিদে, যা সুলতানি আমলের স্থাপত্যের নিদর্শন, আর বানিয়াচংয়ের সাগরদিঘি ও বিথঙ্গল আখড়ায়। শীতে হাওরের ধারে পাখি দেখাও এক বাড়তি পাওনা।

হাওরের থালা, বাগানের চা

হবিগঞ্জের রান্নাঘরে হাওরের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। বর্ষায় হাওরে ধরা দেশি মাছ, যেমন বোয়াল, আইড়, কই, শিং, টাকি আর অসংখ্য ছোট মাছ দিয়ে রাঁধা মাছের ঝোল প্রতিদিনের খাবার; মৌসুমি সবজি আর কাঁচা মরিচের ঝাঁঝে সেই ঝোল হয় পাতলা, হালকা। শুকনো মৌসুমে বাড়তি মাছ রোদে শুকিয়ে বানানো হয় শুঁটকি, যা ভর্তা আর ভুনায় সারা বছর পাতে আসে।

টিলার দিকে গেলে চায়ের কাপ হাতে না নিয়ে ফেরা কঠিন। বাগানের পাশের ছোট দোকানে ঘন দুধ চা এখানে দিনের যেকোনো সময়ের সঙ্গী, আর বাগান থেকে সরাসরি আসা পাতার স্বাদ শহরের চায়ের চেয়ে আলাদা লাগে অনেকের কাছে। পদ আর দোকানের খোঁজ পাবেন হবিগঞ্জের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

শীতের হাওরে আরেকটা দৃশ্য চোখে পড়ে: পানি নেমে যাওয়া বিলে দল বেঁধে মাছ ধরা। সেই মাছের একটা অংশ টাটকা বিক্রি হয়, বাকিটা রোদে শুকিয়ে বা চ্যাপা বানিয়ে রাখা হয় পরের মাসগুলোর জন্য। আর শীতকালের নতুন চালের গুঁড়িতে ভাপা ও চিতই পিঠা, খেজুরের গুড় আর নারকেলের পুর দিয়ে নানা পিঠা হবিগঞ্জের গ্রামেও সমান জনপ্রিয়। চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারগুলোর রান্নায় আবার আলাদা ধরন আছে; বাগানের আশপাশে জন্মানো শাক আর মসলার ব্যবহার তাঁদের খাবারকে অন্য স্বাদ দেয়।

যাতায়াত ও উপযুক্ত মৌসুম

ঢাকা থেকে হবিগঞ্জ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে সড়কপথে সহজে যাওয়া যায়। রেলপথে গেলে সাধারণত শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশনে নেমে সড়কপথে শহরে বা চুনারুঘাটের দিকে যেতে হয়। বন আর চা-বাগান দেখতে বর্ষার শেষ থেকে শীতের শুরু ভালো সময়; হাওরের জলরাশি দেখতে চাইলে বর্ষা, পাখি দেখতে চাইলে শীত।

সাধারণ প্রশ্ন

হবিগঞ্জ নামের উৎপত্তি কী?

প্রচলিত আছে, কবি সৈয়দ সুলতানের বংশধর সৈয়দ হবিব উল্লাহ খোয়াই নদীর তীরে যে বাজার গড়েন, তার নাম হবিবগঞ্জ থেকে হবিগঞ্জ হয়েছে।

তেলিয়াপাড়া কেন ঐতিহাসিক?

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল চুনারুঘাটের তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে কর্নেল ওসমানীর উপস্থিতিতে বাঙালি সেনা কর্মকর্তারা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে এখন একটি স্মৃতিসৌধ আছে।

হবিগঞ্জে বেড়ানোর প্রধান জায়গা কোনগুলো?

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, তেলিয়াপাড়া চা-বাগান ও স্মৃতিসৌধ সবচেয়ে জনপ্রিয়। বানিয়াচংয়ের সাগরদিঘি ও শংকরপাশা শাহী মসজিদও দেখার মতো।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

হবিগঞ্জের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ হবিগঞ্জের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 সিলেট বিভাগের অন্য জেলা