ঝালকাঠি জেলা: পেয়ারা, শীতলপাটি আর নদীবন্দরের শহর
বরিশাল বিভাগ · ৪টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
জেলা প্রশাসনের স্লোগানটাই ঝালকাঠিকে সবচেয়ে ভালো চেনায়: "পেয়ারা আর শীতলপাটি, এই নিয়ে ঝালকাঠি"। আয়তনে বরিশাল বিভাগের ছোট জেলাগুলোর একটি হলেও ঝালকাঠি (Jhalokati) একসময় ছিল দক্ষিণবঙ্গের ব্যস্ততম ব্যবসাকেন্দ্র। সুগন্ধা আর বিষখালী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা এই বন্দরে ভিড়ত ধান, লবণ আর কাঠবোঝাই নৌকা, এখানে কুঠি বানিয়েছিল ইউরোপের বণিকেরা। সেই জৌলুসের জন্য মানুষ একে বলত 'দ্বিতীয় কলকাতা'। আজকের ঝালকাঠিতে সেই ভিড় নেই, কিন্তু বর্ষায় খালের বুকে পেয়ারার নৌকা আর ঘরে ঘরে শীতলপাটির বুনন জেলাটিকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রেখেছে।
জেলেদের 'ঝালো' থেকে ঝালকাঠি
ঝালকাঠির নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলে সম্প্রদায়ের গল্প। এ অঞ্চলে জেলেদের একসময় 'ঝালো' বলা হতো, তাদের বসতিকে বলা হতো ঝালোপাড়া। মনসামঙ্গলের কবি বিজয়গুপ্তের কাব্যেও জেলেদের এই নামে উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রচলিত আছে, নানা জায়গা থেকে জেলেরা মাছ ধরতে এসে সুগন্ধা নদীর পশ্চিম পাড়ে বন-জঙ্গল কেটে বসতি গড়েছিল। 'ঝালো' আর জঙ্গল 'কাটা' মিলে প্রথমে ঝালকাটি, পরে ঝালকাঠি।
আরেকটি ব্যাখ্যা বলে, জেলেদের জালে যে কাঠি ব্যবহার করা হতো, সেই 'জালের কাঠি' কথাটা বদলে বদলে আজকের নাম। দক্ষিণবঙ্গে কাঠি দিয়ে শেষ হওয়া জায়গার নাম অনেক, যেমন স্বরূপকাঠি, রায়েরকাঠি, নৈকাঠি। ফলে নামের দ্বিতীয় অংশটি এই অঞ্চলের বসতি গড়ার পুরোনো রীতির ইঙ্গিত দেয় বলেও অনেকে মনে করেন। জেলা শহরের আরও পুরোনো নাম মহারাজগঞ্জ ছিল বলে জেলা প্রশাসনের তথ্যে উল্লেখ আছে।
নদীবন্দর থেকে জেলা
ঝালকাঠির উত্থান হয়েছিল নদীর হাত ধরে। সুগন্ধা, বিষখালী, গাবখান আর ধানসিঁড়ির মিলনস্থলে অবস্থানের কারণে এখান থেকে দক্ষিণবঙ্গের নানা দিকে নৌপথ খুলে যেত। ঔপনিবেশিক আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ওলন্দাজ ও ফরাসি বণিকেরা এখানে বাণিজ্যকেন্দ্র খুলেছিল বলে জানা যায়। ১৮৭৫ সালে ঝালকাঠি পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দেশের পুরোনো পৌরসভাগুলোর একটি।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ঝালকাঠি মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়। জেলায় চারটি উপজেলা: ঝালকাঠি সদর, নলছিটি, রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া।
মুক্তিযুদ্ধে ঝালকাঠির ইতিহাস রক্তে লেখা। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী ঝালকাঠিতে ঢুকে হত্যা, লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ চালায়। মে মাসে পেয়ারা বাগান এলাকায় প্রতিরোধযোদ্ধাদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়, কারণ ঘন বাগান আর খালের গোলকধাঁধা প্রতিরোধের আড়াল হয়ে উঠেছিল। সদর উপজেলার রমানাথপুরে মসজিদে মুসল্লিদের হত্যা, রাজাপুর থানায় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণসহ নানা ঘটনার পর ৮ ডিসেম্বর ঝালকাঠি শত্রুমুক্ত হয়। জেলায় একাধিক বধ্যভূমি আজও সেই দিনগুলোর সাক্ষী।
সুগন্ধার পাড়ের জীবন
ঝালকাঠির ভূমি সমতল, পলিমাটির, আর জালের মতো খালে ঘেরা। ধান প্রধান ফসল, তবে জেলার আসল সম্পদ তার বাগান। আমড়া, পেয়ারা, নারকেল, সুপারি, কলা আর পান এখানে প্রচুর হয়। বিশেষ করে সদর উপজেলার ভীমরুলি ও আশপাশের গ্রামগুলোতে খালের দুই পাড়ে মাইলের পর মাইল পেয়ারার বাগান।
বাণিজ্যের পুরোনো ঐতিহ্যও পুরোপুরি হারায়নি। লবণ কারখানা, চালকল আর তেলকল এখনো আছে। কুটিরশিল্পের মধ্যে গামছা বোনা, মৃৎশিল্প, বাঁশের কাজ আর সবচেয়ে বিখ্যাত শীতলপাটি। মুর্তা নামের এক ধরনের বেতজাতীয় গাছের সরু ফালি দিয়ে বোনা এই পাটি গরমে শরীর ঠান্ডা রাখে। ঝালকাঠির কয়েকটি গ্রামে বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই কাজ করে আসছে।
শীতলপাটি বোনা ধৈর্যের কাজ। মুর্তার কাণ্ড কেটে পাতলা বেতি তোলা হয়, তারপর রোদে শুকিয়ে, কখনো রং করে, হাতে হাতে বুনে তৈরি হয় নকশা। বাড়ির উঠানে বসে নারীরা গল্প করতে করতে পাটি বোনেন, এমন দৃশ্য এখানকার গ্রামে এখনো চোখে পড়ে। প্লাস্টিকের মাদুরের যুগে চাহিদা কমলেও বিয়ের উপহার বা অতিথির বসার আসন হিসেবে শীতলপাটির কদর এখনো রয়ে গেছে। আর খালের ধারে দাঁড়িয়ে থাকলে বোঝা যায়, এই জেলার মানুষের দিন এখনো জোয়ার-ভাটার হিসাব মেনে চলে: কখন নৌকা ছাড়বে, কখন হাট বসবে, কখন বাগান থেকে ফল নামবে।
কৃতী মানুষের জন্মভূমি
ছোট এই জেলা অবিভক্ত বাংলার ইতিহাসে বড় নাম দিয়েছে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৮৭৩ সালে রাজাপুরের সাতুরিয়া গ্রামে মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলার প্রথম নারী স্নাতকদের একজন, কবি কামিনী রায়ের জন্ম ১৮৬৪ সালে ঝালকাঠির বাসণ্ডা গ্রামে। ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরীর পারিবারিক শিকড়ও কীর্তিপাশার জমিদার পরিবারে।
লোকসংস্কৃতিতে ভাটিয়ালি, বারোমাসি, কবিগান, কীর্তন আর জারিগানের চল ছিল। নদীর দেশ বলে নৌকাবাইচ আর মাঝিদের গানও এখানকার জীবনের অংশ।
ঝালকাঠিতে দেখার মতো যা আছে
ঝালকাঠির সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্য ভীমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাজার। বর্ষায় খালের ওপর সারি সারি ডিঙি নৌকা, প্রতিটিতে সবুজ পেয়ারার স্তূপ, চাষি আর পাইকার পানির ওপরেই দরদাম করছেন। ছোট নৌকা ভাড়া নিয়ে বাগানের ভেতরের খালে ঘুরলে মনে হয় সবুজ এক সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। কাছাকাছি পিরোজপুর ও বরিশালের সীমানাজুড়েও এমন হাট বসে।
সদর উপজেলার কীর্তিপাশা জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষে পুরোনো জমিদারি আমলের স্থাপত্যের চিহ্ন এখনো চোখে পড়ে। গাবখান সেতু থেকে নিচে গাবখান চ্যানেল দেখা যায়, যা দক্ষিণবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। সুজাবাদ কেল্লার নামের সঙ্গে মোগল আমলের স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। আর শহরের পুরোনো পৌরভবন ও নদীর পাড়ের বাজার ঘুরে দেখলে বন্দর শহরের অতীতের আঁচ পাওয়া যায়।
ঝালকাঠির স্বাদ
ঝালকাঠির খাবারের গল্প শুরু হয় বাগান থেকে। মৌসুমে বাগান থেকে সদ্য পাড়া পেয়ারা কাঁচা কামড়ে খাওয়া, লবণ-মরিচ মাখিয়ে খাওয়া কিংবা পেয়ারার জেলি, সবই এখানে প্রিয়। আমড়ার দিনে হাটে আমড়ার স্তূপ জমে যায়, আর বাড়িতে বানানো হয় আমড়ার টক-ঝাল আচার আর আমড়া দিয়ে ডাল।
নদীঘেরা জেলা বলে মাছও পাতে নিয়মিত। বিষখালী আর সুগন্ধার ইলিশ ভাজা এখানকার রান্নাঘরে খুবই সাধারণ পদ, সর্ষের তেলে ভাজা ইলিশের সঙ্গে গরম ভাত আর ভাজার তেল, এর বেশি কিছু লাগে না। পেয়ারা, আমড়া আর ইলিশ নিয়ে আরও জানতে দেখুন ঝালকাঠির বিখ্যাত খাবার।
যাতায়াত ও ঘোরার সময়
ঢাকা থেকে ঝালকাঠি যাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ সড়কপথ, পদ্মা সেতু হয়ে বরিশাল ছুঁয়ে সরাসরি বাস চলে। যাঁরা নদীপথ পছন্দ করেন, তাঁরা সদরঘাট থেকে লঞ্চে যেতে পারেন। ভীমরুলি যেতে হলে জেলা শহর থেকে স্থানীয় যানবাহন বা নৌকায় যাওয়া যায়।
ভাসমান পেয়ারা বাজার দেখতে চাইলে মোটামুটি জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়টা সবচেয়ে ভালো, তখনই পেয়ারার ভরা মৌসুম। অন্য সময় ঘুরতে চাইলে শীতকাল আরামদায়ক।
সাধারণ প্রশ্ন
ঝালকাঠিকে 'দ্বিতীয় কলকাতা' বলা হতো কেন?
নদীবন্দর হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিপুল প্রসারের কারণে ঔপনিবেশিক আমলে ঝালকাঠিকে এই নামে ডাকা হতো।
ভীমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাজার কখন বসে?
পেয়ারার মৌসুমে, সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, খালের ওপর নৌকায় এই হাট বসে।
ঝালকাঠিতে কোন বিখ্যাত ব্যক্তিরা জন্মেছেন?
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক রাজাপুরের সাতুরিয়ায় এবং কবি কামিনী রায় বাসণ্ডা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh