Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

খুলনা জেলা: রূপসার শহর, সুন্দরবনের দুয়ার

খুলনা বিভাগ · ১৪টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. খুল্লনেশ্বরী, ধনপতি আর একটি পুরোনো নথি
  2. প্রাচীন বসতি থেকে আধুনিক জেলা
  3. একাত্তরে খুলনা
  4. নদী, ঘের আর বনের কিনারা
  5. যাঁদের স্মৃতি খুলনার মাটিতে
  6. খুলনায় কোথায় যাবেন
  7. চুইঝাল, চিংড়ি আর কাঁকড়ার রান্নাঘর
  8. ঢাকা থেকে খুলনা
  9. সাধারণ প্রশ্ন

রূপসা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে দেখা যায় নদীতে মালবোঝাই কার্গো, জেলেনৌকা আর খেয়া পারাপারের ছোট ট্রলার। একদিকে শহরের ঘাট, কারখানার পুরোনো চিমনি আর ব্যস্ত বাজার, অন্যদিকে নদী ধরে দক্ষিণে এগোলেই এক সময় পৌঁছে যাওয়া যায় সুন্দরবনে। খুলনা জেলার চরিত্র এই দুই টানের মাঝখানে: একদিকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের সবচেয়ে বড় শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র, অন্যদিকে লোনা জল, চিংড়ির ঘের আর বনের কিনারার জীবন। খুলনা বিভাগের প্রাণকেন্দ্র এই জেলা নিজের নামে একটা বিভাগকেও পরিচিতি দিয়েছে।

খুল্লনেশ্বরী, ধনপতি আর একটি পুরোনো নথি

খুলনা নামের উৎস নিয়ে কয়েকটি মত প্রচলিত আছে। সবচেয়ে পরিচিত গল্পটি মঙ্গলকাব্যের চরিত্র ধনপতি সওদাগরকে ঘিরে। প্রচলিত আছে, ধনপতির দ্বিতীয় স্ত্রী খুল্লনার নামে ভৈরব নদের তীরে খুল্লনেশ্বরী নামে এক কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, আর সেই মন্দির থেকেই আশপাশের জনপদের নাম হয় খুলনা। পুরোনো মন্দিরটি নদীভাঙনে হারিয়ে গেলে পরে কাছাকাছি জায়গায় নতুন মন্দির গড়া হয় বলে জানা যায়। আরেকটি মত বলে, "কিসমত খুলনা" নামের একটি মৌজা থেকে নামটি এসেছে। কেউ কেউ আবার আঠারো শতকের এক ব্রিটিশ নথিতে পাওয়া কাছাকাছি উচ্চারণের একটি নামকেই আদি রূপ মনে করেন। লোককাহিনি আর দলিলের এই টানাপোড়েনেই খুলনার নামের গল্প রয়ে গেছে।

প্রাচীন বসতি থেকে আধুনিক জেলা

পাইকগাছার রেজাকপুরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আট-নয় শতকের বসতির চিহ্ন পাওয়া গেছে, অর্থাৎ এই লোনা জলের অঞ্চলে মানুষের বাস বহু পুরোনো। পঞ্চদশ শতকে খান জাহান আলী এ অঞ্চলের বড় অংশে বসতি গড়েন, তাঁর শাসনকেন্দ্র ছিল পাশের বাগেরহাট। খুলনা শহরের আরেক নাম জাহানাবাদ, এই নামটিও তাঁর স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। ষোড়শ শতকে রাজা প্রতাপাদিত্যের যশোর রাজ্যের প্রভাব এ অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল, পরে মুঘলরা তা দখল করে।

ব্রিটিশ আমলে ১৮৪২ সালে খুলনা মহকুমা গঠিত হয়, তখন তা যশোর জেলার অধীনে। রূপসা-ভৈরবের সংযোগস্থলে নদীবন্দর হিসেবে গুরুত্ব বাড়তে থাকায় ১৮৮২ সালে যশোর ও চব্বিশ পরগনার কিছু অংশ নিয়ে খুলনা আলাদা জেলা হয়। এর দুই বছর পর পৌরসভা গঠিত হয়, আর বিশ শতকে রেলপথ, পাটকল, নিউজপ্রিন্ট কারখানা ও শিপইয়ার্ড খুলনাকে শিল্পনগরীতে পরিণত করে। খালিশপুর আর দৌলতপুরের শিল্পাঞ্চল এক সময় হাজারো শ্রমিকের কর্মস্থল ছিল।

একাত্তরে খুলনা

মুক্তিযুদ্ধে খুলনা ছিল ৯ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। যুদ্ধের শুরুর দিকে গল্লামারীর বেতার কেন্দ্রকে ঘিরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। পরে এই গল্লামারীই পরিণত হয় এক ভয়াবহ বধ্যভূমিতে, সেখানে এখন স্মৃতিসৌধ দাঁড়িয়ে আছে। ডুমুরিয়া, তেরখাদা, পাইকগাছা, ফুলতলা, বটিয়াঘাটা, রূপসায় নানা সময় লড়াই হয়েছে। যুদ্ধের শেষ দিকে দৌলতপুর ও শিরোমণি এলাকায় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর কয়েক দিনের তীব্র লড়াই হয়, যা স্থানীয় ইতিহাসে শিরোমণির যুদ্ধ নামে পরিচিত।

নদী, ঘের আর বনের কিনারা

রূপসা, ভৈরব, শিবসা, পশুর, কপোতাক্ষ, আড়পাঙ্গাশিয়া, কয়রা: খুলনার নদীগুলো জোয়ার-ভাটার। উত্তরের ফুলতলা-দিঘলিয়ার দিকে মিঠা পানির কৃষি, দক্ষিণে ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা, দাকোপ ও কয়রায় লোনা পানির চিংড়ির ঘের। এখানকার চিংড়ি বিদেশে রপ্তানি হয় বলে লোকে একে বলে "সাদা সোনা"। শহরের হিমায়িত মাছ প্রক্রিয়াজাত কারখানাগুলো এই অর্থনীতিরই অংশ।

কয়রা আর দাকোপের মানুষের জীবন সুন্দরবনের সঙ্গে বাঁধা। বাওয়ালিরা গোলপাতা কাটেন, মৌয়ালরা চৈত্র-বৈশাখে মধু সংগ্রহে বনে যান, জেলেরা খালে কাঁকড়া ধরেন। এই অঞ্চল বারবার ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কা খেয়েছে, ভেঙেছে বাঁধ, ঢুকেছে লোনা পানি। তবু বাঁধ মেরামত আর নতুন করে ঘর বাঁধার মধ্য দিয়ে মানুষ টিকে থাকে। লবণাক্ততার কারণে এসব এলাকায় খাবার পানির সংকটও প্রকট, অনেক গ্রামে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সারা বছর চালাতে হয়।

শহর খুলনার চেহারা আবার আলাদা। সরকারি পাটকলগুলোর অনেকগুলো এখন বন্ধ, তবু খালিশপুর-দৌলতপুরের পুরোনো কলোনি আর শ্রমিকপাড়া সেই শিল্পযুগের স্মৃতি বহন করে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে শহরটি এখন শিক্ষারও বড় কেন্দ্র, আর কাছের মোংলা বন্দর ঘিরে বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

যাঁদের স্মৃতি খুলনার মাটিতে

পাইকগাছার রাড়ুলী গ্রামে জন্মেছিলেন রসায়নবিদ ও শিক্ষাবিদ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, বাংলায় রাসায়নিক শিল্পের পথিকৃৎ হিসেবে তিনি স্মরণীয়। তাঁর পৈতৃক বাড়ি আজও রাড়ুলীতে আছে। ফুলতলার দক্ষিণডিহি গ্রাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি, কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর জন্ম এখানে, সেখানে এখন রবীন্দ্র কমপ্লেক্স। রূপসার পিঠাভোগ গ্রামকে ঠাকুর পরিবারের পূর্বপুরুষদের ভিটা বলে মনে করা হয়। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে জারি, সারি, কীর্তন, গাজীর গান আর মনসার ভাসান গানের ধারা ছিল, নৌকাবাইচ আর কাবাডি ছিল প্রিয় খেলা।

খুলনায় কোথায় যাবেন

  • রূপসা নদী ও খান জাহান আলী সেতু, বিশেষ করে বিকেলের আলোয়
  • গল্লামারী বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ
  • ফুলতলার দক্ষিণডিহিতে রবীন্দ্র কমপ্লেক্স ও পাইকগাছার রাড়ুলীতে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বাড়ি
  • বিভাগীয় জাদুঘর
  • দাকোপ বা কয়রা হয়ে সুন্দরবন, অথবা নদীপথে লঞ্চে করে বনের ভেতরের ভ্রমণ

চুইঝাল, চিংড়ি আর কাঁকড়ার রান্নাঘর

খুলনার খাবারের কথা উঠলে প্রথমেই আসে চুইঝাল। চুই একটি লতানো গাছ, যার কাণ্ড ও শিকড় টুকরো করে মাংসের সঙ্গে রান্না করা হয়। রান্না শেষে চুইয়ের টুকরো চিবিয়ে খেলে একটা ঝাঁঝালো, অথচ মরিচের থেকে আলাদা ঝাল জিভে লাগে। খাসি বা গরুর মাংসে চুই দিয়ে রাঁধা চুইঝাল মাংস এখন খুলনার পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে, শহরের অনেক হোটেল শুধু এই একটি পদের জন্যই বিখ্যাত। দূর থেকে আসা মানুষ রাস্তার ধারের হোটেলে বসে মাটির পাত্রে রাঁধা চুইঝাল মাংস খেতে খুলনায় থামেন।

চিংড়ির দেশে চিংড়ি মালাইকারি না থাকলে চলে না। বড় গলদা চিংড়ি নারকেলের দুধে রেঁধে তৈরি এই পদ বিয়েবাড়ি থেকে অতিথি আপ্যায়ন, সবখানেই সম্মানের খাবার। লোনা জলের ঘের আর সুন্দরবনের খাল থেকে আসা কাঁকড়া ঝাল মসলায় ভুনা করে খাওয়ার চলও বাড়ছে, আর কাঁকড়া এখন খুলনার অন্যতম রপ্তানি পণ্যও। পাশাপাশি নদীর ভেটকি, পারশে, টেংরা মাছের ঝোল প্রতিদিনের পাতে থাকে। শীতে ডুমুরিয়ার দিকে খেজুর গুড়ও মেলে। জেলার খাবারের পুরো তালিকা দেখতে পারেন খুলনার বিখ্যাত খাবার পাতায়।

ঢাকা থেকে খুলনা

ঢাকা থেকে খুলনায় সড়ক ও রেলপথে নিয়মিত যাতায়াত চলে। পদ্মা সেতু হয়ে বাসে এখন কয়েক ঘণ্টাতেই পৌঁছানো যায়, আর আন্তঃনগর ট্রেনও চলে। কাছের বিমানবন্দর যশোরে, সেখান থেকে সড়কপথে খুলনা আসা সহজ। ঘোরার সেরা সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, যখন সুন্দরবন ভ্রমণের মৌসুম চলে আর নদী থাকে শান্ত।

সাধারণ প্রশ্ন

খুলনা নামের উৎপত্তি কীভাবে?

প্রচলিত মতে, ধনপতি সওদাগরের স্ত্রী খুল্লনার নামে প্রতিষ্ঠিত খুল্লনেশ্বরী মন্দির থেকে খুলনা নামের উৎপত্তি। "কিসমত খুলনা" মৌজা থেকে নাম আসার মতও প্রচলিত আছে।

চুইঝাল কী?

চুই একটি লতাজাতীয় গাছ, যার কাণ্ড ও শিকড় মসলা হিসেবে মাংসে দেওয়া হয়। এতে মাংসে ঝাঁঝালো, সুগন্ধি একটা ঝাল আসে, যা খুলনা অঞ্চলের রান্নার বিশেষত্ব।

খুলনা জেলা কবে গঠিত হয়?

১৮৪২ সালে খুলনা মহকুমা হয় এবং ১৮৮২ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

খুলনার খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ খুলনার খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 খুলনা বিভাগের অন্য জেলা