কুষ্টিয়া জেলা: বাউলের সুর আর সাহিত্যের তীর্থ
খুলনা বিভাগ · ৬টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
কার্তিকের এক সন্ধ্যায় কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় গেলে মনে হবে পুরো জনপদটাই একতারা হাতে গান গাইছে। লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ির চারপাশে সাদা পোশাকের সাধু-গুরু, মাটিতে বসা শ্রোতা, আর রাত জুড়ে "মিলন হবে কত দিনে" জাতীয় পদের সুর। এই একটি দৃশ্যই হয়তো কুষ্টিয়াকে সবচেয়ে ভালো বোঝায়। খুলনা বিভাগের উত্তরের এই জেলায় একদিকে বাউল দর্শন, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের জমিদারি, মীর মশাররফ হোসেনের জন্মভিটা আর কাঙাল হরিনাথের ছাপাখানা। তাই কুষ্টিয়াকে অনেকে বলেন বাংলার সাংস্কৃতিক রাজধানী, আর এর পেছনে যুক্তিও আছে।
পাট, বন্দর আর একটি নাম
কুষ্টিয়া নামের উৎপত্তি নিয়ে কয়েকটি গল্প প্রচলিত আছে। সবচেয়ে বেশি যে ব্যাখ্যাটি শোনা যায়, তা পাটের সঙ্গে জড়ানো। এ অঞ্চলে এক সময় প্রচুর পাট হতো, আর স্থানীয়ভাবে পাটকে বলা হতো "কোষ্টা" বা "কুষ্টি"। সেই শব্দ থেকেই কুষ্টিয়া নামের জন্ম বলে অনেকে মনে করেন। আরেকটি লোককথা বলে, সম্রাট শাহজাহানের আমলে এখানে কুষ্টি নামে একটি নদীবন্দর ছিল, যাকে ঘিরে শহর গড়ে ওঠে। কেউ কেউ এর পেছনে বিদেশি শব্দের প্রভাবের কথাও বলেন। নিশ্চিত প্রমাণ কোনোটিরই নেই, তবে পাট আর নদীবাণিজ্য যে এই শহরের ভিত গড়েছিল, তা ইতিহাস থেকেই স্পষ্ট।
নদীয়া থেকে আলাদা জেলা
আঠারো শতকে কুষ্টিয়া অঞ্চল নাটোরের জমিদারদের অধীনে ছিল। ব্রিটিশ আমলে এটি নদীয়া জেলার অংশ। উনিশ শতকে নীলচাষ নিয়ে কৃষকদের ক্ষোভ এ অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছিল, আর নীল বিদ্রোহের ঢেউ কুষ্টিয়ার গ্রামগুলোতেও লেগেছিল। এরপর কুষ্টিয়া পৌরসভা গঠিত হয় উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে।
রেল এসেছিল এখানে আগেভাগেই। কলকাতা থেকে আসা রেললাইনের সূত্রে কুষ্টিয়ার জগতি স্টেশনকে বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রথম রেলস্টেশনগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। পরে বিশ শতকের গোড়ায় পদ্মার ওপর ভেড়ামারায় নির্মিত হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, যা আজও উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের রেলযোগাযোগের অন্যতম প্রধান সেতু।
১৯৪৭ সালের দেশভাগে নদীয়ার কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর মহকুমা নিয়ে গঠিত হয় কুষ্টিয়া জেলা। ১৯৮৪ সালে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর আলাদা জেলা হলে বর্তমান কুষ্টিয়ার সীমানা দাঁড়ায়।
একাত্তরের প্রতিরোধ
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই কুষ্টিয়ায় বড় প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। মার্চের শেষে শহরে অবস্থান নেওয়া পাকিস্তানি সেনাদের ওপর ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র আর সাধারণ মানুষ মিলে আক্রমণ চালায়, যা কুষ্টিয়া প্রতিরোধযুদ্ধ নামে পরিচিত। পরে শহরের বিভিন্ন জায়গায়, বংশীতলায়, দৌলতপুরে আরও সংঘর্ষ হয়। জেলায় অনেকগুলো গণকবর চিহ্নিত হয়েছে, আর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে রয়েছে "মুক্তবাংলা" ভাস্কর্য।
পদ্মা, গড়াই আর উর্বর মাঠ
জেলার উত্তর সীমানা জুড়ে পদ্মা, তার শাখা গড়াই শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। আছে মাথাভাঙ্গা আর কুমার নদও। পলিমাটির এই সমতলে ধান, পাট, গম, আখ, তামাক, পেঁয়াজ আর সবজি হয়। দৌলতপুর আর মিরপুরের চরাঞ্চলে বর্ষায় নদীভাঙন আর শুকনো মৌসুমে বালুচর, দুটোই মানুষের জীবনের অংশ। শুকনো মৌসুমে পদ্মার বুকে জেগে ওঠা চরে মানুষ বাদাম, ডাল আর তরমুজ চাষ করেন, বর্ষা এলে আবার সব ডুবে যায়। চাপাইগাছি বিল জেলার বড় জলাভূমিগুলোর একটি, শীতে সেখানে পাখি আর পিকনিকের দল দুটোরই ভিড় হয়।
কুমারখালী তাঁতের জন্য বিখ্যাত। এখানকার তাঁতিরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম চাদর, লুঙ্গি, গামছা বুনে আসছেন, আর কুমারখালীর বিছানার চাদর এখন ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। জেলার মৃৎশিল্পও পুরোনো। ভেড়ামারায় তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র আর পাশের পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এই অঞ্চলের শিল্পচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
লালন, রবীন্দ্রনাথ, মীর মশাররফ
লালন সাঁই জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন ছেঁউড়িয়ায়, ১৮৯০ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু। তাঁর মাজার ঘিরে প্রতি বছর দোলপূর্ণিমায় এবং পয়লা কার্তিক তাঁর তিরোধান দিবসে বিশাল সাধুসঙ্গ ও মেলা বসে। দেশ-বিদেশের বাউল ও গবেষকেরা তখন ছেঁউড়িয়ায় ভিড় করেন।
কুমারখালীর শিলাইদহে ঠাকুর পরিবারের জমিদারির কাছারি। রবীন্দ্রনাথ উনিশ শতকের শেষ দশকে জমিদারি দেখাশোনার জন্য এখানে দীর্ঘ সময় কাটান, পদ্মায় বোটে ভেসে লিখেছেন অনেক গল্প, কবিতা আর চিঠি। কুঠিবাড়িটি এখন জাদুঘর। কুমারখালীর লাহিনীপাড়ায় জন্মেছিলেন "বিষাদ-সিন্ধু"র লেখক মীর মশাররফ হোসেন। একই উপজেলায় কাঙাল হরিনাথ মজুমদার "গ্রামবার্তা প্রকাশিকা" নামে পত্রিকা বের করতেন, যা গ্রামের কৃষক-প্রজার দুঃখের কথা তুলে ধরত। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী বাঘা যতীনের জন্মও কুষ্টিয়ার কয়া গ্রামে।
এত বড় বড় নামের ভিড়ে কুষ্টিয়ার সাধারণ মানুষের সংস্কৃতিও কম সমৃদ্ধ নয়। গ্রামে মুর্শিদি, মারফতি, জারি আর গাজীর গান গাওয়া হয়, পুঁথিপাঠের আসর আর পুতুলনাচও এক সময় হাটের দিনের বড় আকর্ষণ ছিল। শহরে নাট্যদল আর গানের স্কুলের সংখ্যাও চোখে পড়ার মতো, যেন সাহিত্য আর সুরের এই উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের হাতেও পৌঁছে গেছে।
কোথায় ঘুরবেন
- ছেঁউড়িয়ায় লালন সাঁইয়ের মাজার ও আখড়াবাড়ি
- শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি ও পদ্মার পাড়
- লাহিনীপাড়ায় মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা
- ভেড়ামারার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও পাশের লালন শাহ সেতু
- কুমারখালীর তাঁতপল্লি ও কাঙাল হরিনাথের স্মৃতি জাদুঘর
তিলের খাজা, কুলফি আর শীতের গুড়
কুষ্টিয়ার নাম শুনলে অনেকের মুখে প্রথমে আসে তিলের খাজা। চিনি বা গুড়ের সিরাপ জ্বাল দিয়ে টেনে টেনে হালকা করা হয়, তারপর তাতে তিল মিশিয়ে লম্বা কাঠির মতো খাজা বানানো হয়। মুখে দিলে মচমচে ভেঙে যায়, তিলের সুবাস থেকে যায় অনেকক্ষণ। ট্রেনে বা বাসে কুষ্টিয়া পার হওয়ার সময় হকারদের "তিলের খাজা" ডাক বহু যাত্রীর চেনা। ২০২৩ সালে কুষ্টিয়ার তিলের খাজা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।
গরমের সন্ধ্যায় শহরের মোড়ে মোড়ে মালাই কুলফির হাঁড়ি নিয়ে বসেন বিক্রেতারা। ঘন দুধ জ্বাল দিয়ে ছাঁচে জমানো এই কুলফি মাটির হাঁড়িতে বরফ-লবণের মধ্যে রাখা হয়, অর্ডার দিলে কেটে পাতায় বা প্লেটে পরিবেশন করা হয়। শীতে আবার খেজুর রস আর গুড়ের সময়, গ্রামে গ্রামে পিঠার আয়োজন। নতুন গুড়ের পাটালি আর মুড়ির মোয়া, ভাপা পিঠা আর দুধপুলি তখন ঘরে ঘরে তৈরি হয়, আর লালন মেলার মাঠেও জিলাপি, খাজা আর মুড়ি-মুড়কির দোকান সারি বেঁধে বসে। কুষ্টিয়ার খাবার নিয়ে বিস্তারিত পাবেন কুষ্টিয়ার বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাতায়াত ও মৌসুম
ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় সড়ক ও রেলপথে যাওয়া যায়। বাস নিয়মিত চলে, আর খুলনাগামী কিছু আন্তঃনগর ট্রেন কুষ্টিয়ার পোড়াদহ হয়ে যায়। বেড়ানোর সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। লালন মেলা দেখতে চাইলে পয়লা কার্তিক বা দোলপূর্ণিমার সময় যাওয়ার পরিকল্পনা করা ভালো।
সাধারণ প্রশ্ন
কুষ্টিয়া কেন বিখ্যাত?
লালন সাঁইয়ের মাজার, রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি, মীর মশাররফ হোসেনের জন্মস্থান, কুমারখালীর তাঁত আর তিলের খাজার জন্য কুষ্টিয়া বিখ্যাত।
লালন মেলা কখন হয়?
ছেঁউড়িয়ায় লালনের মাজারে দোলপূর্ণিমায় এবং পয়লা কার্তিক তাঁর তিরোধান দিবসে বড় আকারে সাধুসঙ্গ ও মেলা হয়।
কুষ্টিয়ার তিলের খাজা কীভাবে তৈরি হয়?
চিনি বা গুড়ের সিরাপ জ্বাল দিয়ে টেনে হালকা করে তাতে তিল মিশিয়ে লম্বা টুকরো করে কাটা হয়। এটি এখন ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃত।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh