লক্ষ্মীপুর জেলা: মেঘনার তীরে নারকেল-সুপারির দেশ
চট্টগ্রাম বিভাগ · ৫টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
লক্ষ্মীপুরের গ্রামের পথে হাঁটলে প্রথমেই চোখে পড়ে আকাশছোঁয়া সুপারি গাছের সারি আর তার ফাঁকে ফাঁকে নারকেলের ঝাঁকড়া মাথা। বাড়ির পেছনের পুকুরঘাটে নারকেলের খোল শুকাচ্ছে, উঠোনে স্তূপ করা সুপারি। আরও পশ্চিমে গেলে দৃশ্য বদলে যায়: দিগন্ত পর্যন্ত মেঘনার ঘোলা জল, নতুন জাগা চর, আর তার ওপর সবুজ গালিচার মতো বিছানো সয়াবিনের খেত। লক্ষ্মীপুর জেলা যেন দেবী লক্ষ্মীর নামের মতোই ফসলে ভরা এক জনপদ, যদিও নদীভাঙন এখানকার মানুষকে বারবার নতুন করে ঘর বাঁধতে শিখিয়েছে।
নামের নানা ব্যাখ্যা
লক্ষ্মীপুর নামটি নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে। সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হলো, ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মীর নামের সঙ্গে "পুর" যোগ হয়ে নামটি এসেছে, যা এই উর্বর অঞ্চলের সমৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। কেউ কেউ শাহ সুজার আমলের লক্ষ্মীদাহ পরগনার সঙ্গে নামের সম্পর্ক খোঁজেন। আবার প্রচলিত আছে, লক্ষ্মীনারায়ণ রায় নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিবারের নাম থেকে জায়গাটির নাম হয়েছে। উনিশ শতকের ব্রিটিশ মানচিত্রে "লাখিপুর" বানানও পাওয়া যায়, যা থেকে বোঝা যায় নামটি বেশ পুরোনো। কোন ব্যাখ্যাটি সঠিক, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
ভুলুয়া রাজ্য থেকে আধুনিক জেলা
মধ্যযুগে এই অঞ্চল ছিল ভুলুয়া রাজ্যের অংশ, যার কেন্দ্র বর্তমান লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালীর সীমানা অঞ্চলে বলে ধরা হয়। জেলার একটি নদীর নাম এখনও ভুলুয়া, যা সেই পুরোনো রাজ্যের নাম মনে করিয়ে দেয়। উপকূলের কাছে হওয়ায় ষোড়শ থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত এখানে লবণ উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা ছিল। ব্রিটিশ আমলে লক্ষ্মীপুর ছিল নোয়াখালী জেলার অংশ, পরে মহকুমা হয়। ১৯৮৪ সালে নোয়াখালী থেকে আলাদা হয়ে লক্ষ্মীপুর পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
স্বদেশি আন্দোলনেও এই অঞ্চলের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর মহাত্মা গান্ধী শান্তির বার্তা নিয়ে বৃহত্তর নোয়াখালীর যে গ্রামগুলোতে ঘুরেছিলেন, তার মধ্যে রামগঞ্জ অঞ্চলও ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো
১৯৭১ সালে লক্ষ্মীপুরের মুক্তিযোদ্ধারা নানা জায়গায় পাকিস্তানি বাহিনীর মুখোমুখি হন। রহমতখালী নদীর সেতুর কাছের যুদ্ধটি স্থানীয়ভাবে সবচেয়ে আলোচিত, যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী বড় ক্ষতির শিকার হয়েছিল বলে জানা যায়। মীরগঞ্জ আর ফতেহপুর দিঘির কাছেও সংঘর্ষ হয়। এসব যুদ্ধের স্মৃতি জেলার মানুষ এখনও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। প্রতি বছর ডিসেম্বরে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে সেই দিনগুলোর গল্প শোনে, আর স্থানীয় স্মৃতিস্তম্ভগুলোতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। গ্রামের প্রবীণদের মুখে আজও শোনা যায়, কীভাবে নদী আর খালের পথ চিনে মুক্তিযোদ্ধারা নৌকায় করে যাতায়াত করতেন।
মেঘনার চর আর মাটির সোনা
লক্ষ্মীপুরের পশ্চিম সীমানা জুড়ে বয়ে চলেছে বিশাল মেঘনা। রামগতি আর কমলনগর উপজেলা নদীর একেবারে তীরে, যেখানে ভাঙন আর চর জাগা দুটোই নিত্যঘটনা। এক মৌসুমে যে গ্রাম নদীতে হারায়, কয়েক বছর পর কাছেই জেগে ওঠে নতুন চর, আর মানুষ সেখানে আবার বসতি গড়ে। জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ডাকাতিয়া, রহমতখালী আর ভুলুয়ার মতো নদী ও খাল।
চরের দোআঁশ মাটি সয়াবিন চাষের জন্য দারুণ উপযোগী। দেশে উৎপাদিত সয়াবিনের বড় একটা অংশ আসে লক্ষ্মীপুর থেকে, তাই অনেকে আদর করে জেলাটিকে "সয়াল্যান্ড" বলেন। নারকেল আর সুপারি এখানকার আরেক বড় ফসল; জেলার বাজারগুলো থেকে সুপারি যায় দেশের নানা প্রান্তে। মেঘনায় ইলিশ ধরা রামগতি-কমলনগরের হাজারো জেলে পরিবারের জীবিকা। রায়পুরে রয়েছে একটি বড় মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র, যেখান থেকে মাছের পোনা ছড়িয়ে পড়ে নানা জেলায়। প্রবাসী আয়ও এখানকার অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে।
মানুষ ও তাদের গর্ব
লক্ষ্মীপুরের মানুষ নোয়াখালী অঞ্চলের ভাষায় কথা বলেন, যার টান আর রসবোধ সারা দেশে পরিচিত। গ্রামে গ্রামে পুরোনো দিঘি, মসজিদ আর জমিদারবাড়ি এখানকার সামাজিক ইতিহাসের সাক্ষী। রায়পুরের "জ্বীনের মসজিদ" নামে পরিচিত পুরোনো মসজিদটি উনিশ শতকের শেষ দিকে নির্মিত, আর এর নাম ঘিরে নানা লোককাহিনি প্রচলিত আছে।
এই জেলার মানুষ নানা ক্ষেত্রে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্ট জয়ী নিশাত মজুমদারের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদউল্লাহও এই জেলার সন্তান ছিলেন।
কয়েকটি দর্শনীয় স্থান
দালাল বাজার জমিদারবাড়ি জেলার সবচেয়ে পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপনা। কয়েক শতাব্দী পুরোনো এই জমিদারবাড়ির ভবন, দিঘি আর মন্দিরের কাঠামো এখনও দাঁড়িয়ে আছে, যদিও অনেক অংশ জীর্ণ। এর কাছেই খোয়াসাগর দিঘি, বিশাল এক পুরোনো জলাশয় যার পাড়ে বিকেলে মানুষ হাওয়া খেতে আসে। কমলনগরের মতিরহাট আর রামগতির আলেকজান্ডারের মেঘনা তীরকে স্থানীয়রা "মেঘনা বিচ" বলেন; বিকেলে সেখানে নদীর বিশালতা আর সূর্যাস্ত দেখতে ভিড় জমে। মজু চৌধুরীর হাট মেঘনার তীরের একটি নৌঘাট, যেখান থেকে ভোলার দিকে নৌযান চলে।
ইলিশ, ডাব আর পিঠার আপ্যায়ন
লক্ষ্মীপুরে অতিথি এলে প্রথমেই হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় একটা কাটা ডাব। বাড়ির গাছ থেকে সদ্য পাড়া ডাবের মিষ্টি পানি আর নরম শাঁস এখানে আপ্যায়নের প্রথম ধাপ। গ্রীষ্মে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ভ্যানে ডাবের স্তূপ চোখে পড়ে।
দুপুরের খাবারে মেঘনার ইলিশের স্থান সবার ওপরে। রামগতি-কমলনগরের ঘাটে সদ্য নামানো ইলিশ সর্ষের তেলে ভেজে ভাতের সঙ্গে খাওয়া হয়, আর ভাজার তেলটুকুও ফেলে দেওয়া হয় না। নারকেলের প্রাচুর্যের কারণে এখানকার রান্নায় নারকেলের দুধ আর কোরানো নারকেলের ব্যবহারও বেশ চোখে পড়ে। শীতকালে নারকেল-গুড়ের পুর দিয়ে নানা রকম পিঠা বানানো হয়: ভাপা, পাটিসাপটা, নারকেলের পুলি। নোয়াখালী অঞ্চলের চেনা পিঠাগুলোর চলও এখানে আছে। চরাঞ্চলে মহিষের দুধ থেকে টক দই বানানোর চলও আছে, যা মাটির পাত্রে জমিয়ে হাটে বিক্রি হয়। মেঘনার পাড়ের ছোট হোটেলগুলোতে গেলে দেখা যায়, দুপুরে ভাতের সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে ইলিশের ঝোল, ছোট মাছের চচ্চড়ি আর ডাল, আর দাম জানতে চাইলে দোকানি হেসে বলেন মাছ আজ কত সস্তা পড়েছে। সুপারির দেশ বলে খাওয়ার পর পান-সুপারি এগিয়ে দেওয়াও এখানে আতিথেয়তার অঙ্গ। জেলার খাবার নিয়ে আরও তথ্য পাবেন লক্ষ্মীপুরের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাত্রার কথা
ঢাকা থেকে লক্ষ্মীপুর যাওয়ার প্রধান উপায় সড়কপথ; কুমিল্লা হয়ে কিংবা চাঁদপুর হয়ে নিয়মিত বাস চলে। কেউ কেউ ঢাকা থেকে লঞ্চে চাঁদপুর গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথে আসেন। শীতকাল, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, ঘোরার জন্য আরামদায়ক, তখন মেঘনা শান্ত আর পিঠার মৌসুমও চলে। ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে বর্ষার মাঝামাঝি থেকে শরতের শুরু ভালো সময়।
সাধারণ প্রশ্ন
লক্ষ্মীপুরকে সয়াল্যান্ড বলা হয় কেন?
মেঘনার চরাঞ্চলের মাটিতে প্রচুর সয়াবিন চাষ হয় এবং দেশের উৎপাদিত সয়াবিনের বড় অংশ আসে এই জেলা থেকে। সেই কারণেই এই আদুরে নাম।
লক্ষ্মীপুর কবে জেলা হয়?
১৯৮৪ সালে নোয়াখালী জেলা থেকে আলাদা হয়ে লক্ষ্মীপুর পূর্ণাঙ্গ জেলা হয়।
লক্ষ্মীপুরে কোথায় মেঘনার সূর্যাস্ত দেখা যায়?
কমলনগরের মতিরহাট ও রামগতির আলেকজান্ডারের মেঘনা তীর সূর্যাস্ত দেখার জন্য জনপ্রিয়। বিকেলে এখানে স্থানীয় ও দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh