Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

লালমনিরহাট জেলা: সীমান্ত, রেললাইন আর তিস্তার জেলা

রংপুর বিভাগ · ৫টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. লালমনি নামের তিন ব্যাখ্যা
  2. রেল, বিমানঘাঁটি আর সীমান্ত
  3. মুক্তিযুদ্ধে ৬ নম্বর সেক্টর
  4. তিস্তা আর ধরলার মাঝখানে
  5. কবি, জমিদারবাড়ি আর লোকগান
  6. দেখার মতো জায়গা
  7. মাছের ঝোল, শীতের পিঠা আর এক কাপ চা
  8. যাত্রার তথ্য
  9. সাধারণ প্রশ্ন

লালমনিরহাট শহরে পা রাখলে প্রথমেই চোখে পড়ে রেলের ছাপ। পুরোনো লাল ইটের রেল কোয়ার্টার, বিশাল স্টেশন চত্বর আর রেল বিভাগের দপ্তর মনে করিয়ে দেয়, এই শহরের বেড়ে ওঠা অনেকটাই রেললাইনকে ঘিরে। শহরের অন্য প্রান্তে পড়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজদের তৈরি এক বিশাল বিমানঘাঁটি, যেখানে আজ আর নিয়মিত বিমান নামে না। আর জেলার উত্তরে, ভারতের কোচবিহার সীমান্তে, আছে তিনবিঘা করিডোর আর দহগ্রাম, যাদের গল্প দুই দেশের সীমানা-ইতিহাসেরই একটি অধ্যায়। লালমনিরহাট জেলা তাই ছোট হলেও গল্পে ভরা।

লালমনি নামের তিন ব্যাখ্যা

নামটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে কয়েকটি গল্প প্রচলিত আছে। একটি মতে, এখানকার মাটির নিচে লাল রঙের পাথর বা লাল মাটির আভা দেখা যেত, সেখান থেকে "লালমনি" নাম। আরেকটি মত বেশি আবেগের: প্রচলিত আছে, ১৭৮৩ সালে রংপুর অঞ্চলে নূরলদীনের নেতৃত্বে যে কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল, তাতে লালমনি নামে এক নারী কৃষকনেত্রী ইংরেজ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, আর তাঁর নামেই জায়গাটির নাম। পরে "লালমনি"-র সঙ্গে "হাট" যুক্ত হয়ে নাম দাঁড়ায় লালমনিরহাট। এসব গল্পের কোনোটিই নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়, তবে দ্বিতীয় গল্পটি স্থানীয় মানুষের কাছে বেশি প্রিয়।

রেল, বিমানঘাঁটি আর সীমান্ত

লালমনিরহাট বহুদিন বৃহত্তর রংপুর জেলার অংশ ছিল। ইংরেজ আমলে রেলপথ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এখানে রেলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে, আর শহরটি পরিচিত হয় রেলওয়ে বিভাগীয় শহর হিসেবে। চাকরির সূত্রে উর্দুভাষী অনেক মানুষও এখানে বসবাস শুরু করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার শহরের কাছে বিপুল জমি অধিগ্রহণ করে একটি বিমানঘাঁটি তৈরি করে। মিত্রবাহিনী বার্মা ফ্রন্টে অভিযানের জন্য এটিকে সামনের সারির ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করত। যুদ্ধ শেষে ঘাঁটির ব্যবহার প্রায় থেমে যায়; পঞ্চাশের দশকের শেষে অল্প সময়ের জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল চালুর চেষ্টাও হয়েছিল। বর্তমানে জায়গাটি বিমানবাহিনীর তত্ত্বাবধানে।

জেলার আরেকটি বিশেষ ইতিহাস সীমান্ত ঘিরে। পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ভারতের ভূখণ্ড দিয়ে ঘেরা বাংলাদেশের একটি অংশ, যা তিনবিঘা করিডোর দিয়ে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। একসময় লালমনিরহাটে অনেকগুলো ছিটমহল ছিল; ২০১৫ সালে দুই দেশের স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সেই ছিটমহলগুলোর মানুষ নাগরিকত্ব পান। দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা বাংলাদেশের অংশ হিসেবেই রয়ে গেছে। চুক্তির আগে কয়েক দশক ধরে ছিটমহলের বাসিন্দারা কার্যত কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক সুবিধা পেতেন না; স্কুল, হাসপাতাল কিংবা বাজারে যেতেও তাঁদের নানা বাধা পেরোতে হতো। তাই ২০১৫ সালের সেই বিনিময় এখানকার বহু পরিবারের জীবনে বড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। ১৯৮৪ সালে লালমনিরহাট আলাদা জেলা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে ৬ নম্বর সেক্টর

মুক্তিযুদ্ধের সময় লালমনিরহাট ছিল ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে, আর পাটগ্রামের বুড়িমারীতে একটি বিদ্যালয়ে ছিল সেক্টরের সদর দপ্তর। এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তানি বাহিনী সদর ও আদিতমারীতে ঢুকে হত্যাযজ্ঞ চালায়, কয়েক দিন পর হাতীবান্ধায় বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। রেলের বহু কর্মকর্তা ও কর্মচারীও এ সময় প্রাণ হারান। ডিসেম্বরের শুরুতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে, আর ৬ ডিসেম্বর লালমনিরহাট শত্রুমুক্ত হয়। জেলায় একাধিক গণকবর চিহ্নিত হয়েছে, যার অনেকগুলো রেললাইনের আশপাশে।

তিস্তা আর ধরলার মাঝখানে

লালমনিরহাট লম্বাটে একটি জেলা, যার এক পাশে তিস্তা, অন্য পাশে ধরলা। এ দুই নদীর পলিতে জমি উর্বর, তাই জেলার বেশির ভাগ মানুষ কৃষিজীবী; ধান, ভুট্টা, তামাক আর আলু এখানকার প্রধান ফসল। তিস্তার চরে ভুট্টা চাষ গত কয়েক দশকে অনেক কৃষকের ভাগ্য বদলেছে। তবে বর্ষায় তিস্তার পানি বাড়লে বন্যা আর শুষ্ক মৌসুমে পানির টান, দুটোই এখানকার মানুষকে ভোগায়।

হাতীবান্ধার দোয়ানীতে তিস্তার ওপর নির্মিত তিস্তা ব্যারাজ দেশের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্পগুলোর একটির প্রাণকেন্দ্র; এর পানি দিয়ে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমিতে সেচ দেওয়া হয়। লালমনিরহাট থেকে বুড়িমারী পর্যন্ত প্রায় চুরাশি কিলোমিটারের একটি রেলপথ জেলার উত্তর প্রান্তকে সদরের সঙ্গে জুড়ে রেখেছে; পথে ছোট ছোট স্টেশন, দুই পাশে ধানক্ষেত, তামাকের জমি আর বাঁশঝাড়। এই লোকাল ট্রেনে চড়ে সীমান্তের দিকে যাওয়া লালমনিরহাটকে কাছ থেকে দেখার একটি সহজ উপায়। পাটগ্রামের বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারত ও ভুটানের সঙ্গে পণ্য আমদানি-রপ্তানি চলে, তাই সীমান্তের এই কোণে বাণিজ্যের ব্যস্ততাও কম নয়।

কবি, জমিদারবাড়ি আর লোকগান

লালমনিরহাটের সবচেয়ে পরিচিত সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব কবি শেখ ফজলল করিম। ১৮৮২ সালে কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনায় তাঁর জন্ম। মানুষের মধ্যেই স্বর্গ-নরক খোঁজার কথা বলা তাঁর কবিতা আজও বহু পাঠকের মুখে মুখে ফেরে। কাকিনা নিজেও ইতিহাসের জায়গা; এখানকার জমিদারদের স্মৃতি নিয়ে আছে জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আর একটি স্মৃতি জাদুঘর।

জেলার লোকসংস্কৃতিতে ভাওয়াইয়া, পল্লিগীতি, বাউল আর মেয়েলি গীতের চর্চা আছে। গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ছড়া, ধাঁধা আর প্রবাদের এক সমৃদ্ধ ভান্ডার আজও বেঁচে আছে।

দেখার মতো জায়গা

হাতীবান্ধার তিস্তা ব্যারাজ এলাকা আর তার আশপাশের নদীতীর ছুটির দিনে মানুষের ভিড়ে জমজমাট থাকে। পাটগ্রামে তিনবিঘা করিডোর আর দহগ্রাম দেখতে যাওয়া এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা, কাছেই বুড়িমারী স্থলবন্দর। সদরের তিস্তা রেলসেতু আর সড়কসেতু, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত নিদারিয়া মসজিদ, কাকিনা জমিদারবাড়ি আর ধরলার পাড়ের মোগলহাটও ঘুরে দেখা যায়। জেলায় "হারানো মসজিদ" নামে পরিচিত একটি প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ ঘিরেও স্থানীয় মানুষের আগ্রহ রয়েছে।

মাছের ঝোল, শীতের পিঠা আর এক কাপ চা

লালমনিরহাটের খাবার সহজ ও ঘরোয়া। তিস্তা আর ধরলার মাছ দিয়ে হালকা ঝোল, সঙ্গে গরম ভাত আর আলু ভর্তা, এই হলো এখানকার সাধারণ দুপুরের থালা। শীত নামলেই উত্তরের এই জেলায় পিঠার উৎসব শুরু হয়; চালের গুঁড়ার ভাপা, চিতই আর তেলে ভাজা পিঠা গ্রাম থেকে শহরের ফুটপাত পর্যন্ত বিক্রি হয়। রেলস্টেশন আর হাটবাজারের চায়ের দোকানে ঘন দুধ চা হাতে আড্ডা এখানকার সন্ধ্যার চেনা ছবি। জেলার খাবারের পুরো তালিকা দেখুন লালমনিরহাটের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাত্রার তথ্য

ঢাকা থেকে সড়কপথে বাসে লালমনিরহাট যাওয়া যায়, আর রেলপথে সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেনও চলে। আকাশপথে গেলে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নেমে সড়কপথে আসতে হয়। তিস্তা ব্যারাজ আর সীমান্ত এলাকা ঘোরার জন্য অক্টোবর থেকে মার্চ সবচেয়ে ভালো সময়; শীতের সকালে কুয়াশা থাকে, তবে দিনগুলো আরামদায়ক। সীমান্তঘেঁষা এলাকায় ঘোরার সময় সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র রাখা এবং নির্দেশনা মেনে চলা ভালো, কারণ কিছু জায়গায় চলাচলে নিয়ম মানতে হয়।

সাধারণ প্রশ্ন

লালমনিরহাট কিসের জন্য বিখ্যাত?

তিস্তা ব্যারাজ, তিনবিঘা করিডোর, বুড়িমারী স্থলবন্দর আর রেলওয়ে বিভাগীয় শহর হিসেবে লালমনিরহাট পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের পুরোনো বিমানঘাঁটিও জেলার একটি বিশেষ নিদর্শন।

তিনবিঘা করিডোর কোথায়?

তিনবিঘা করিডোর লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায়। এটি দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাকে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

লালমনিরহাট কবে শত্রুমুক্ত হয়?

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর লালমনিরহাট পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত হয়।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

লালমনিরহাটের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ লালমনিরহাটের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 রংপুর বিভাগের অন্য জেলা