মাগুরা জেলা: সীতারামের দিঘি থেকে নবগঙ্গার ঘাট
খুলনা বিভাগ · ৪টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
মহম্মদপুরের মাঠে এখনো কিছু উঁচু ঢিবি আর ভাঙা ইটের স্তূপ চোখে পড়ে। স্থানীয়রা দেখিয়ে বলেন, এখানে ছিল রাজা সীতারাম রায়ের প্রাসাদ, ওইটা রামসাগর দিঘি। আঠারো শতকের গোড়ায় যে রাজা মুঘল সুবাদারের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তাঁর রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ আজ ধানক্ষেতের মাঝে নিঃশব্দে পড়ে আছে। খুলনা বিভাগের ছোট্ট জেলা মাগুরা এমনই, বাইরে থেকে শান্ত গ্রামীণ জনপদ, কিন্তু একটু খুঁড়লেই বেরিয়ে আসে জলদস্যু, বিদ্রোহী রাজা, নীলকর আর কবির গল্প।
মগ জলদস্যু ও মাগুরার নাম
মাগুরা নামের উৎস নিয়ে যে গল্পগুলো প্রচলিত আছে, তার প্রায় সবই মগ জলদস্যুদের সঙ্গে জড়ানো। মুঘল আমলে আরাকানের মগ দস্যুরা নদীপথে বাংলার ভেতরে ঢুকে লুটপাট চালাত। প্রচলিত আছে, নবগঙ্গা ও কুমার নদের সংযোগস্থলে তাদের একটি ঘাঁটি ছিল, আর "মগরা" থেকেই কালক্রমে মাগুরা নামের উৎপত্তি। আরেকটি গল্প বলে, নবাব মুর্শিদকুলি খানের বাহিনী এখানেই মগদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে তাদের ফিরিয়ে দিয়েছিল, মগেরা যেখান থেকে "ঘুরে" গিয়েছিল, সেই জায়গার নাম হয় মগঘুরা, পরে মাগুরা। দুটি গল্পই লোকশ্রুতি, তবে নদীপথে দস্যুর উপদ্রব যে এ অঞ্চলের ইতিহাসে বড় ঘটনা ছিল, তা অন্য সূত্রেও পাওয়া যায়।
সীতারাম রায়ের রাজধানী
মাগুরার ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাজা সীতারাম রায়। আঠারো শতকের শুরুতে তিনি মহম্মদপুরে রাজধানী গড়ে তোলেন। প্রচলিত আছে, মগ ও বর্গি দস্যুদের দমনে তিনি সফল হয়েছিলেন, আর আত্মসমর্পণকারী অনেককে নিজের সেনাবাহিনীতে জায়গা দিয়েছিলেন। প্রজাদের জলকষ্ট মেটাতে তিনি বড় বড় দিঘি খনন করান, তার মধ্যে রামসাগর, সুখসাগর আর কৃষ্ণসাগরের নাম আজও লোকমুখে ফেরে। পরে মুঘল সুবাদারের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাধে, তাঁর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মহম্মদপুরের গৌরবও ম্লান হয়ে যায়। বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের "সীতারাম" উপন্যাস এই রাজাকে কেন্দ্র করেই লেখা।
ব্রিটিশ আমলে উত্তরের দিকে দস্যুতা ও অশান্তি দমনের প্রয়োজনে ১৮৪৫ সালে মাগুরা যশোর জেলার একটি মহকুমা হয়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি এ অঞ্চলেও নীলকরদের বিরুদ্ধে কৃষকেরা প্রতিবাদে নেমেছিলেন। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ মাগুরা পূর্ণাঙ্গ জেলা হয়।
একাত্তরের মাগুরা
মুক্তিযুদ্ধে মাগুরা ছিল ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে। জেলাজুড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর বেশ কয়েকটি সংঘর্ষ হয়। মাগুরা-যশোর সড়কের পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনার কথাও স্থানীয় ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। শহরের পিটিআই চত্বরসহ কয়েকটি জায়গায় গণকবর চিহ্নিত হয়েছে, পিটিআইয়ের প্রধান ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে আছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ।
নদী, বিল আর কৃষি
মাগুরার মানচিত্রে নদীর রেখা অনেক: গড়াই-মধুমতী, নবগঙ্গা, কুমার, ফটকি, চিত্রা। জেলার পূর্ব সীমান্ত ধরে বয়ে গেছে মধুমতী, যা পার হলেই ফরিদপুর অঞ্চল। বর্ষায় নিচু জমি আর বিলগুলো পানিতে ভরে ওঠে, তখন ডিঙি নৌকায় মাছ ধরা আর শাপলা তোলার দৃশ্য সাধারণ।
এখানকার বেশির ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ধান, পাট, আখ, গম, ডাল, পেঁয়াজ আর সবজি প্রধান ফসল। মাগুরার পাট এক সময় নদীপথে দূরদূরান্তে যেত। খেজুর গাছও প্রচুর, শীতে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই গুড় জ্বাল দেওয়ার ধোঁয়া ওঠে।
নদীর পাড়ের গ্রামগুলোতে এখনো অনেক পরিবার মাছ ধরে জীবিকা চালায়। শুকনো মৌসুমে নদী সরু হয়ে এলে বাঁশের চাঁই আর ঘুনি পেতে ছোট মাছ ধরা হয়, বর্ষায় জাল নিয়ে নৌকায় ভাসেন জেলেরা। জেলা শহরটি নবগঙ্গার তীরে, শহরের মাঝখান দিয়ে নদী বয়ে যাওয়ায় সন্ধ্যায় ঘাটে বসে থাকা মাগুরার মানুষের পুরোনো অভ্যাস। গত কয়েক বছরে সড়ক যোগাযোগ ভালো হওয়ায় এখানকার সবজি, পাট আর মাছ সহজেই ঢাকার বাজারে পৌঁছাচ্ছে, কৃষকেরাও তাই নতুন ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
ফররুখ আহমদ ও লোকসংস্কৃতি
শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামে জন্মেছিলেন কবি ফররুখ আহমদ। "পাঞ্জেরি"র মতো কবিতা আর "সাত সাগরের মাঝি" কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর বাড়ি এখন দর্শনার্থীদের দেখার জায়গা। সমুদ্র, নাবিক আর অভিযাত্রার রূপক তাঁর কবিতায় বারবার এসেছে, অথচ তাঁর শৈশব কেটেছে নদী আর মাঠে ঘেরা এই শান্ত গ্রামে।
গ্রামীণ মাগুরায় জারিগান, সারিগান, ভাটিয়ালি, কবিগান আর যাত্রাপালার চর্চা ছিল জোরালো। নদীর দেশ বলে বর্ষার শেষে নৌকাবাইচের আয়োজনও হয়। মহম্মদপুরের বাবুখালীতে মাঘ মাসে যে ঘোড়দৌড় ও মেলা বসে, তা প্রায় শতবর্ষের বেশি পুরোনো বলে স্থানীয়রা জানান। কয়েক দিনের এই মেলায় ঘোড়দৌড় দেখতে আশপাশের জেলা থেকেও মানুষ আসেন, সঙ্গে চলে নাগরদোলা, মিষ্টির দোকান আর গানের আসর।
দেখার মতো জায়গা
মাগুরায় ঘোরার জায়গাগুলো ছোট ছোট, কিন্তু প্রতিটির সঙ্গে একটা গল্প আছে। মহম্মদপুরে রাজা সীতারাম রায়ের রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ ও দিঘিগুলো দেখে ইতিহাসের একটা স্পর্শ পাওয়া যায়। মাঝাইলে কবি ফররুখ আহমদের বাড়ি সাহিত্যপ্রেমীদের টানবে। শহরের সিদ্ধেশ্বরী মঠ পুরোনো উপাসনালয়গুলোর একটি। শ্রীপুরের জমিদারবাড়ির ভবনগুলো ভগ্নদশায় হলেও তাদের স্থাপত্যে পুরোনো জৌলুস টের পাওয়া যায়। আর গড়াই সেতুর ওপর থেকে বিকেলে নদী দেখা একটা শান্ত অভিজ্ঞতা।
নদীর মাছ, গুড় আর পিঠা
মাগুরার খাবার আসলে নদী আর মাঠের খাবার। নবগঙ্গা, মধুমতী আর বিল থেকে আসা রুই, কাতলা, শোল, বোয়াল, টেংরা, পুঁটি এখানকার প্রতিদিনের পাতের অংশ। গৃহস্থ বাড়িতে মাছের ঝোল রাঁধা হয় সাদামাটা, কখনো আলু-বেগুন দিয়ে, কখনো শুধু কাঁচামরিচ আর ধনেপাতা ছড়িয়ে। বর্ষায় ছোট মাছের চচ্চড়ি আর শীতে শোল মাছের ঝোল বিশেষ প্রিয়।
শীত এলে মাগুরার গ্রামগুলো খেজুর গুড়ের গন্ধে ভরে যায়। গাছিরা ভোরে রস নামান, তারপর উঠানের চুলায় জ্বাল দিয়ে বানান ঝোলা গুড় আর পাটালি। নতুন গুড় আর নতুন চালের গুঁড়ায় তৈরি হয় ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা আর দুধে ভেজানো রসের পিঠা। পৌষ সংক্রান্তিতে পিঠার আয়োজন এখানে পারিবারিক উৎসবের মতো। জামাই আর মেয়েকে দাওয়াত করে পিঠা খাওয়ানোর রেওয়াজ এখনো অনেক বাড়িতে টিকে আছে, আর হাটে নতুন গুড়ের দাম নিয়ে দরদাম শীতের সকালের পরিচিত দৃশ্য। আরও জানতে দেখুন মাগুরার বিখ্যাত খাবার।
যাবেন কীভাবে, কখন
ঢাকা থেকে মাগুরায় সাধারণত সড়কপথে যাওয়া হয়। পদ্মা সেতু চালুর পর ফরিদপুর হয়ে বাসে যাত্রা আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে সম্ভব। বেড়ানোর জন্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে উপযুক্ত, তখন খেজুর রসের মৌসুম, আর মাঘে গেলে বাবুখালীর ঘোড়দৌড়ের মেলাও দেখা যেতে পারে।
সাধারণ প্রশ্ন
মাগুরা নামের উৎপত্তি কী?
প্রচলিত মতে, মুঘল আমলে এ অঞ্চলে মগ জলদস্যুদের ঘাঁটি বা তাদের ফিরে যাওয়ার ঘটনা থেকে "মগরা" বা "মগঘুরা" হয়ে মাগুরা নামের উৎপত্তি।
রাজা সীতারাম রায়ের রাজধানী কোথায় ছিল?
রাজা সীতারাম রায়ের রাজধানী ছিল বর্তমান মাগুরা জেলার মহম্মদপুরে, সেখানে তাঁর প্রাসাদ ও দিঘির ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়।
মাগুরা জেলা কবে গঠিত হয়?
মাগুরা ১৮৪৫ সালে যশোর জেলার মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত হয়।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh