Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

মানিকগঞ্জ জেলা: লোকগান আর হাজারি গুড়ের দেশ

ঢাকা বিভাগ · ৭টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. নামের রহস্য
  2. মহকুমা থেকে জেলা
  3. পাঁচ নদীর পলিমাটি
  4. লোকগান, মেলা আর গুণী মানুষ
  5. যেখানে ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে
  6. খাবার: হাজারি গুড় থেকে নদীর মাছ
  7. যাতায়াত ও ভ্রমণের সময়
  8. সাধারণ প্রশ্ন

শীতের রাতে হরিরামপুরের ঝিটকা এলাকায় কিছু পরিবার যে গুড় তৈরি করে, তা এতটাই হালকা রঙের আর মিহি যে হাতে নিয়ে চাপ দিলে প্রায় গুঁড়ো হয়ে যায়। এর নাম হাজারি গুড়, আর এটি মানিকগঞ্জ জেলার সবচেয়ে মিষ্টি পরিচয়। জেলার নিজস্ব স্লোগানও এই গুড় আর লোকগানকে মিলিয়ে তৈরি। ঢাকার পশ্চিমে, পদ্মা আর যমুনার মিলনস্থলের কাছে অবস্থিত এই জেলা একসময় উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের পথে ফেরিঘাটের জন্য সবার চেনা ছিল। কিন্তু ঘাটের ভিড় পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় পুরোনো জমিদারবাড়ি, গ্রামীণ মেলা আর বাউল-বিচ্ছেদের সুরে ভরা এক শান্ত জনপদ।

নামের রহস্য

মানিকগঞ্জ নামের উৎস নিয়ে কয়েকটি মত আছে। শব্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘মানিক’ অর্থ মূল্যবান রত্ন, আর ‘গঞ্জ’ ফারসি থেকে আসা শব্দ, যার অর্থ বাজার। প্রচলিত আছে, মানিক শাহ নামে এক সুফি সাধক এ অঞ্চলে এসেছিলেন, আর তাঁর নামেই জায়গার নাম। আরেকটি লোককথায় মানিক ঢালী নামে এক পাঠান সর্দারের কথা বলা হয়। কোনোটিরই নিশ্চিত প্রমাণ নেই, তবে গঞ্জ বা বাজারকে ঘিরে বসতি গড়ে ওঠার কথাটা প্রায় সব গল্পেই আছে।

মহকুমা থেকে জেলা

ব্রিটিশ আমলে ১৮৪৫ সালে মানিকগঞ্জ মহকুমা গঠিত হয়, প্রথমে ফরিদপুর জেলার অধীনে। এর কয়েক বছর পর মহকুমাটি ঢাকা জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৮৪ সালে মানিকগঞ্জ পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়। জেলার সাতটি উপজেলা হলো মানিকগঞ্জ সদর, সিঙ্গাইর, সাটুরিয়া, ঘিওর, শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানিকগঞ্জে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। নদী আর খালের পথে পাকিস্তানি সেনাদের নৌকায় আক্রমণ চালিয়ে কয়েকটি নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনা স্থানীয় ইতিহাসে স্মরণীয়। নভেম্বরে ঘিওরের তেরশ্রী গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা বহু গ্রামবাসীকে হত্যা করে, যা জেলার সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কয়েকটি সংঘর্ষের পর ১৪ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়।

পাঁচ নদীর পলিমাটি

মানিকগঞ্জের মাটি গড়ে উঠেছে নদীর পলিতে। পশ্চিম আর দক্ষিণ সীমানায় যমুনা ও পদ্মা, আর জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা, ইছামতী ও গাজীখালী। দৌলতপুর আর হরিরামপুরের বড় অংশ চরাঞ্চল, যেখানে বর্ষায় নদী ভাঙে আর শুকনো মৌসুমে নতুন চরে চাষ হয়।

জীবিকার প্রধান ভিত্তি কৃষি। ধান, পাট, গম, সরিষা, ডাল আর নানা রকম সবজির চাষ হয় এখানে। শীতে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করা অনেক পরিবারের বাড়তি আয়ের উৎস। শিবালয়ের আরিচা আর পাটুরিয়া ঘাট দীর্ঘদিন ধরে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগের প্রধান নদীপথ ছিল; ঘাটকে ঘিরে হোটেল, দোকান আর পরিবহনের বড় কর্মসংস্থান গড়ে উঠেছিল। জেলাজুড়ে হাটবাজার আর বছরজুড়ে অসংখ্য গ্রামীণ মেলাও এখানকার অর্থনীতির অংশ।

লোকগান, মেলা আর গুণী মানুষ

মানিকগঞ্জকে বলা হয় লোকসংগীতের জেলা। বাউল, বিচ্ছেদ আর মুর্শিদি গানের আসর এখানে বহুদিনের, আর গ্রামে গ্রামে এখনো ঘেটু গান, বেহুলা-লখিন্দরের পালা বা বেরা ভাসানের মতো লোকআচার টিকে আছে। শীত ও বসন্তে বিভিন্ন দরগাহ ও মন্দিরকে ঘিরে বসে মেলা, যেখানে মাটির খেলনা, বাঁশ-বেতের জিনিস আর মিঠাই-মুড়কির দোকান সাজানো থাকে।

এই জেলা উপমহাদেশের সংস্কৃতিতে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে দিয়েছে। উপমহাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম দিকের পথিকৃৎদের একজন হীরালাল সেন মানিকগঞ্জের মানুষ। নাট্যকার ও শিক্ষাবিদ মুনীর চৌধুরী জন্মেছিলেন মানিকগঞ্জে; একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, আর তিনি আর ফেরেননি। ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য পরিচিত অভিনেতা, সুরকার ও চলচ্চিত্রকার খান আতাউর রহমানের জন্ম সিঙ্গাইরের রামকান্তপুর গ্রামে।

তেওতা গ্রামকে ঘিরে একটি গল্প মানিকগঞ্জের মানুষ খুব ভালোবেসে বলেন। প্রচলিত আছে, ১৯২০-এর দশকের গোড়ায় কাজী নজরুল ইসলাম এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তেওতায় এসেছিলেন, আর সেখানেই প্রথম দেখা হয় আশালতা সেনগুপ্তের সঙ্গে, যিনি পরে প্রমীলা দেবী নামে তাঁর স্ত্রী হন। জমিদারবাড়ির দেয়ালের ভেতরে বসে কবি কোনো প্রেমের কবিতা লিখেছিলেন, এমন কথাও শোনা যায়, তবে তা জনশ্রুতি। প্রমীলা দেবীর পরিবার জমিদারবাড়ির পাশের একটি বাড়িতে থাকত বলে জানা যায়। এই গল্পের টানেই অনেক দর্শনার্থী আজও যমুনার কাছের এই ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ দেখতে আসেন।

যেখানে ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে

  • বালিয়াটি জমিদারবাড়ি, সাটুরিয়া: লবণ ব্যবসায়ী গোবিন্দ রাম সাহার উত্তরসূরিদের গড়া কয়েকটি প্রাসাদের সমষ্টি, এখন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত জাদুঘর।
  • তেওতা জমিদারবাড়ি, শিবালয়: যমুনার কাছে পুরোনো প্রাসাদ ও নবরত্ন মন্দির; কাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী প্রমীলা দেবীর পরিবারের স্মৃতি এই গ্রামের সঙ্গে জড়িত।
  • আরিচা ও পাটুরিয়া ঘাট: যমুনা-পদ্মার বিশালতা আর ফেরির আসা-যাওয়া দেখার জায়গা।
  • ঝিটকা, হরিরামপুর: শীতে হাজারি গুড় তৈরির দৃশ্য দেখার সুযোগ।

খাবার: হাজারি গুড় থেকে নদীর মাছ

মানিকগঞ্জের খাবারের তালিকায় সবার আগে খেজুরের গুড়, আর তার মধ্যে বিশেষ হাজারি গুড়। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, প্রায় দুইশ বছর আগে হাজারি নামের এক গাছি এই বিশেষ পদ্ধতিতে গুড় বানানো শুরু করেন, তাঁর নামেই এর নাম। সাধারণ গুড়ের চেয়ে এটি অনেক হালকা রঙের, প্রায় সাদাটে, আর তৈরি করতে অনেক বেশি রস লাগে। ঝিটকার কয়েকটি পরিবার বংশপরম্পরায় এই কাজ ধরে রেখেছে, আর মানিকগঞ্জের হাজারি গুড় এখন ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে। খেজুর গাছ কমে যাওয়ায় খাঁটি হাজারি গুড় এখন দুর্লভ, বাজারে নকলও পাওয়া যায়, তাই কেনার সময় সতর্ক থাকা ভালো।

নদীর জেলায় প্রতিদিনের খাবারে মাছের ঝোল অবধারিত। যমুনা-পদ্মার মোহনার কাছে ধরা পড়া ইলিশ, পাঙাশ, বোয়াল আর চিংড়ির পাশাপাশি খাল-বিলের দেশি মাছ রান্না হয় আলু, বেগুন বা লাউ দিয়ে। আরিচা-পাটুরিয়া ঘাটের হোটেলগুলোতে ভাতের সঙ্গে নদীর মাছ খাওয়া বহু যাত্রীর কাছে পরিচিত অভিজ্ঞতা। শীতে গুড় দিয়ে তৈরি হয় ভাপা পিঠা, দুধ চিতই, পাটিসাপটা আর রসের পায়েস। গ্রামের হাটে শীতের বিকেলে চুলায় বসানো কড়াইয়ে গুড়ের জিলাপি আর খই-মুড়কির দোকানেও ভিড় দেখা যায়, আর মেলার মৌসুমে গুড়ের তৈরি বাতাসা ও কদমা শিশুদের প্রিয়। আরও খাবারের খোঁজ পাবেন মানিকগঞ্জের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাতায়াত ও ভ্রমণের সময়

ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ সাধারণত সড়কপথে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ধরে বাসে বা গাড়িতে যাওয়া হয়; জেলায় রেলপথ নেই। পাটুরিয়া থেকে ফেরিতে পদ্মা পার হয়ে দৌলতদিয়া হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দিকেও যাওয়া যায়। হাজারি গুড় আর পিঠার স্বাদ নিতে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে ভালো সময়; জমিদারবাড়ি ঘোরার জন্যও শীতের আবহাওয়া আরামদায়ক।

সাধারণ প্রশ্ন

হাজারি গুড় কোথায় তৈরি হয়?

হাজারি গুড় মূলত মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়। শীতকালই এর মৌসুম।

বালিয়াটি জমিদারবাড়ি কোথায়?

বালিয়াটি জমিদারবাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায়। এটি এখন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত একটি জাদুঘর।

মানিকগঞ্জ কবে জেলা হয়?

১৮৪৫ সালে মহকুমা হিসেবে যাত্রা শুরুর পর ১৯৮৪ সালে মানিকগঞ্জ পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

মানিকগঞ্জের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ মানিকগঞ্জের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 ঢাকা বিভাগের অন্য জেলা