Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

মেহেরপুর জেলা: আমবাগানে জন্ম নেওয়া এক সরকারের ঠিকানা

খুলনা বিভাগ · ৩টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. মেহের আলী, না মিহির?
  2. নদীয়ার মহকুমা থেকে স্বাধীন জেলা
  3. মুজিবনগর: একাত্তরের সবচেয়ে বড় অধ্যায়
  4. ভৈরব, মাথাভাঙ্গা আর আমের বাগান
  5. মানুষ ও সংস্কৃতি
  6. যেখানে যাবেন
  7. সাবিত্রী, রসকদম আর আমের মৌসুম
  8. যাতায়াত ও সময়
  9. সাধারণ প্রশ্ন

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল সকালে মেহেরপুরের সীমান্তঘেঁষা গ্রাম বৈদ্যনাথতলার একটি আমবাগানে কয়েকটি চৌকি পেতে তৈরি হয়েছিল মঞ্চ। সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়, শপথ নেয় বাংলাদেশের প্রথম সরকার। জায়গাটির নাম রাখা হয় মুজিবনগর। আজও সেই আমবাগানের ছায়ায় দাঁড়ালে ইতিহাস যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। খুলনা বিভাগের সবচেয়ে ছোট জেলাগুলোর একটি মেহেরপুর, কিন্তু বাংলাদেশের জন্মকথায় এর জায়গা অনেক বড়।

মেহের আলী, না মিহির?

মেহেরপুর নামের উৎস নিয়ে দুটি গল্প শোনা যায়, কোনোটিই দলিলে প্রমাণিত নয়। একটি মতে, এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে আসা দরবেশ মেহের আলী শাহের নাম থেকে জনপদের নাম হয় মেহেরপুর। অন্য মতটি আরও প্রাচীন কাহিনিকে টেনে আনে। প্রচলিত আছে, জ্যোতির্বিদ মিহির ও তাঁর পুত্রবধূ খনা এই এলাকায় বাস করতেন, আর "মিহিরপুর" থেকে কালক্রমে মেহেরপুর। খনার বচন যে বাংলার কৃষকের মুখে মুখে ফেরে, সেই খনার সঙ্গে নিজেদের জনপদকে জুড়ে দেওয়ার গল্পটি স্থানীয়দের কাছে বেশ প্রিয়।

নদীয়ার মহকুমা থেকে স্বাধীন জেলা

মেহেরপুরের প্রাচীন ইতিহাস খুব স্পষ্ট নয়। পাল, সুলতানি ও মুঘল শাসন পেরিয়ে অঞ্চলটি নদীয়ার রাজাদের প্রভাবে ছিল, পরে আসে ব্রিটিশ শাসন। ব্রিটিশ আমলে মেহেরপুর ছিল নদীয়া জেলার একটি মহকুমা। উনিশ শতকে নীলকরদের দাপট এখানে ছিল প্রবল, আমঝুপি ও ভাটপাড়ার নীলকুঠি সেই সময়ের সাক্ষী। নীলচাষে বাধ্য করা কৃষকদের ওপর অত্যাচারের কাহিনি এ অঞ্চলের লোকস্মৃতিতে আজও রয়ে গেছে।

আমঝুপি কুঠি নিয়ে একটি গল্প বিশেষভাবে প্রচলিত আছে। বলা হয়, পলাশীর যুদ্ধের আগে রবার্ট ক্লাইভ ও মীর জাফরের মধ্যে শেষ দফার গোপন বৈঠক এই কুঠিতেই হয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবে এর কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই, তবু কাজলা নদীর তীরের এই পুরোনো ভবনটিকে ঘিরে কাহিনিটি লোকের মুখে মুখে ফেরে।

দেশভাগের পর মেহেরপুর কুষ্টিয়া জেলার মহকুমা হয়। ১৯৮৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মেহেরপুর আলাদা জেলা হিসেবে যাত্রা শুরু করে।

মুজিবনগর: একাত্তরের সবচেয়ে বড় অধ্যায়

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই মেহেরপুরের মানুষ প্রতিরোধে নামেন। মার্চের শেষে গাংনী এলাকায় আনসার, মুজাহিদ আর সাধারণ মানুষ মিলে পাকিস্তানি সেনাদের রুখে দেন। এরপর আসে ১৭ এপ্রিল। সেদিন বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে, যা ভবেরপাড়া গ্রামের অংশ, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন, আর অস্থায়ী সরকারের সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। এই সরকারের নেতৃত্বেই পরের নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। পরদিনই পাকিস্তানি বাহিনী মেহেরপুর শহরে হত্যাযজ্ঞ চালায়। মেহেরপুর কলেজের পেছনে, কাজীপুরে ও টেপুখালীতে গণহত্যার স্থান চিহ্নিত হয়েছে।

শপথের জায়গায় এখন গড়ে উঠেছে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স। স্মৃতিসৌধের ত্রিভুজাকৃতি দেয়ালগুলো আর লাল বেদি এক নজরে চোখ টানে। কমপ্লেক্সে বাংলাদেশের মানচিত্রে মুক্তিযুদ্ধের এগারোটি সেক্টর দেখানো হয়েছে, আছে নানা ভাস্কর্য আর জাদুঘর। ২০০০ সালে মুজিবনগর আলাদা উপজেলা হয়। প্রতি বছর ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসে এখানে বড় আয়োজন হয়।

ভৈরব, মাথাভাঙ্গা আর আমের বাগান

মেহেরপুরের নদীগুলো ছোট: ভৈরব, মাথাভাঙ্গা, কাজলা, ইছামতীর একটি অংশ। জেলার পশ্চিম সীমানা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে, আর পুব দিকে চুয়াডাঙ্গা। মাটি উর্বর, সমতল, তাই বেশির ভাগ মানুষ কৃষিজীবী। ধান, পাট, গম, ভুট্টা আর সবজির জন্য মেহেরপুর পরিচিত, বিশেষ করে গাংনীর সবজি দেশের নানা বাজারে যায়।

তবে মেহেরপুরের মাঠের আসল গৌরব আম। হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালিসহ নানা জাতের আমবাগান জেলাজুড়ে ছড়িয়ে আছে। মে-জুনে বাগানগুলো আমের ভারে নুয়ে পড়ে, ব্যাপারীরা ট্রাক নিয়ে আসেন, শহরের আড়তে দিনরাত দরদাম চলে। মুজিবনগরের আমবাগান তো ইতিহাসেরই অংশ।

আম ছাড়াও জেলায় লিচু, কলা আর পেয়ারার বাগান বাড়ছে। সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোর জীবনে কাঁটাতারের বেড়া একটা নিত্য বাস্তবতা, ওপারের গ্রামের সঙ্গে ভাষা, রান্না আর উৎসবে মিল থাকলেও যাতায়াত সীমিত। বিকেলে গাংনী বা মুজিবনগরের মেঠোপথে হাঁটলে দেখা যায় মাঠ থেকে ফিরছে গরুর পাল, উঠানে শুকানো হচ্ছে ভুট্টা আর পাট, আর বাড়ির পাশের পুকুরে ছেলেমেয়েরা সাঁতার কাটছে।

মানুষ ও সংস্কৃতি

মেহেরপুরের লোকসংস্কৃতিতে বাউল গান, দেহতত্ত্ব, পালাগান আর কবিগানের প্রভাব আছে, কুষ্টিয়ার পাশের জেলা বলে লালনের ভাবধারাও এখানে গভীর। পুরোনো দিনে কাঁথা সেলাই, খেজুরপাতার পাটি আর বেতের কাজ ছিল ঘরে ঘরে। "রহস্য লহরী" সিরিজের জন্য পরিচিত লেখক দীনেন্দ্রকুমার রায়ের জন্ম মেহেরপুরে। মুজিবনগরের ভবেরপাড়ায় রয়েছে প্রায় শতবর্ষ পুরোনো একটি গির্জা, যা এ অঞ্চলের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের দীর্ঘ উপস্থিতির সাক্ষী।

যেখানে যাবেন

  • মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স ও ঐতিহাসিক আমবাগান
  • কাজলা নদীর তীরে আমঝুপি নীলকুঠি
  • গাংনীর ভাটপাড়া নীলকুঠি ও তার পাশের ইকোপার্ক
  • ভবেরপাড়ার পুরোনো গির্জা

জেলাটি ছোট বলে এক বা দুই দিনেই প্রধান জায়গাগুলো দেখে নেওয়া যায়। শহর থেকে মুজিবনগর যেতে সময় লাগে আধা ঘণ্টার মতো, পথের দুপাশে আমবাগান আর সবজির মাঠ। আমঝুপি কুঠিতে বিকেলে গেলে কাজলা নদীর পাড়ে রোদ পড়ে আসা দেখা যায়, আর ভাটপাড়ার ইকোপার্কে পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর ব্যবস্থাও আছে।

সাবিত্রী, রসকদম আর আমের মৌসুম

মেহেরপুরে গেলে মিষ্টির দোকানে একবার না থেমে ফেরা কঠিন। এখানকার সবচেয়ে পরিচিত মিষ্টি সাবিত্রী: ঘন করে জ্বাল দেওয়া দুধ থেকে তৈরি এই মিষ্টির রং গাঢ়, স্বাদে দুধের ঘনত্ব স্পষ্ট টের পাওয়া যায়। ঢাকায় আত্মীয়স্বজনের জন্য মেহেরপুর থেকে সাবিত্রীর বাক্স নিয়ে যাওয়া অনেক পরিবারের রীতি। এর সঙ্গে আছে রসকদম, ছোট রসগোল্লার মতো মিষ্টির গায়ে ক্ষীর আর পোস্তদানার প্রলেপ। শহরের পুরোনো মিষ্টির দোকানগুলো এই দুটি মিষ্টির জন্যই বহু বছর ধরে পরিচিত।

গ্রীষ্মে মেহেরপুরের খাবার মানেই আম। পাকা হিমসাগর কেটে খাওয়া, কাঁচা আমের ডাল, আমের আচার, আর মৌসুম শেষে আমসত্ত্ব, সবই বাড়িতে বাড়িতে চলে। শীতে আবার খেজুর গুড় দিয়ে ভাপা আর চিতই পিঠা, সঙ্গে নতুন চালের পায়েস। গ্রামের বাড়িতে অতিথি এলে আমের মৌসুমে থালায় আম আর দুধ-ভাত, শীতে পিঠা আর গুড়, এই আপ্যায়নটুকু মেহেরপুরের আন্তরিকতার পরিচয়। খাবার নিয়ে বিস্তারিত পাবেন মেহেরপুরের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাতায়াত ও সময়

ঢাকা থেকে মেহেরপুরে সরাসরি বাস চলে, সড়কপথই প্রধান উপায়। ট্রেনে যেতে চাইলে খুলনাগামী আন্তঃনগর ট্রেনে চুয়াডাঙ্গায় নেমে সেখান থেকে সড়কপথে মেহেরপুর যাওয়া যায়। আম খেতে চাইলে মে-জুন সবচেয়ে ভালো, আর আরামে ঘুরতে চাইলে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। ইতিহাসে আগ্রহী হলে ১৭ এপ্রিলের মুজিবনগর দিবসের আয়োজনও দেখে আসতে পারেন।

সাধারণ প্রশ্ন

মুজিবনগর কোথায় এবং কেন বিখ্যাত?

মুজিবনগর মেহেরপুর জেলায়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল এখানকার বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নেয়, তাই এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

মেহেরপুরের বিখ্যাত মিষ্টি কোনটি?

মেহেরপুরের সবচেয়ে পরিচিত মিষ্টি সাবিত্রী, সঙ্গে রসকদমও জনপ্রিয়।

মেহেরপুর জেলা কবে গঠিত হয়?

ব্রিটিশ আমলে নদীয়ার এবং পরে কুষ্টিয়ার মহকুমা থাকার পর ১৯৮৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মেহেরপুর আলাদা জেলা হয়।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

মেহেরপুরের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ মেহেরপুরের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 খুলনা বিভাগের অন্য জেলা