মুন্সিগঞ্জ জেলা: বিক্রমপুরের ইতিহাস, নদী আর খাবারের গল্প
ঢাকা বিভাগ · ৬টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
মুন্সিগঞ্জের পুরোনো মানুষদের কাছে নিজের জায়গার পরিচয় জানতে চাইলে অনেকেই এখনো বলেন "বিক্রমপুর"। মানচিত্রে জেলার নাম বদলেছে, প্রশাসনের খাতায় উপজেলা ভাগ হয়েছে, কিন্তু এই পুরোনো নামটা মানুষের মুখ থেকে মোছেনি। ঢাকার দক্ষিণে পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী আর ইছামতীর মাঝখানে জেগে থাকা এই নিচু, পলিমাটির জনপদ একসময় বাংলার রাজনীতির কেন্দ্র ছিল। আজকের মুন্সিগঞ্জ জেলা ছয়টি উপজেলা নিয়ে গড়া — শ্রীনগর, সিরাজদিখান, মুন্সিগঞ্জ সদর, গজারিয়া, লৌহজং আর টঙ্গিবাড়ী। ঢাকা থেকে এক-দেড় ঘণ্টার পথ, অথচ এর মাটির নিচে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের গল্প।
বিক্রমপুর থেকে মুন্সিগঞ্জ: নামের পেছনের কথা
এ অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন নাম বিক্রমপুর। পাল, চন্দ্র, বর্মণ ও সেন — একাধিক রাজবংশের সময়ে এখানে রাজধানী বা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল বলে ইতিহাসবিদেরা মনে করেন। সেন রাজাদের আমলে বিক্রমপুর ছিল তাঁদের রাজধানী, আর সেই সময়ের স্মৃতি বহন করে রামপালের বল্লাল সেনের দিঘির মতো নিদর্শন।
মোগল আমলে এলাকাটি ইদ্রাকপুর নামে পরিচিত হয়। পরে "মুন্সিগঞ্জ" নাম কোথা থেকে এল, তা নিয়ে দুটি মত প্রচলিত আছে। একটি মতে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময়ের জমিদার মুন্সি এনায়েত আলীর নাম থেকে জায়গাটির নাম হয়েছে। আরেকটি মতে, মোগল আমলের এক রাজকর্মচারী হায়দার আলী মুন্সির নামের সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে। কোনটি ঠিক, তা নিয়ে চূড়ান্ত প্রমাণ নেই, তবে দুটো গল্পেই "মুন্সি" শব্দটা ঘুরেফিরে আসে।
রাজা, পণ্ডিত আর বারো ভূঁইয়া
বিক্রমপুরের নাম শুনলে অনেকের প্রথমেই মনে পড়ে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের কথা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই বৌদ্ধ পণ্ডিত বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মেছিলেন। পরে তিনি তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধধর্মের সংস্কারে বড় ভূমিকা রাখেন, আর সেখানেই তাঁর জীবনের শেষ অংশ কাটে। বজ্রযোগিনীতে তাঁর স্মৃতিতে গড়ে ওঠা স্থাপনা দেখতে এখনো দেশ-বিদেশের মানুষ আসেন। কাছাকাছি রঘুরামপুরে খননে একটি বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার খবর এ অঞ্চলের বৌদ্ধ অতীতকে আরও স্পষ্ট করেছে।
রামপালে আছে বাবা আদমের মসজিদ — সুলতানি আমলের এই ছোট্ট ইটের মসজিদটি জেলার সবচেয়ে পুরোনো মুসলিম স্থাপনাগুলোর একটি। মোগল যুগে বিক্রমপুরের চাঁদ রায় ও কেদার রায় বারো ভূঁইয়াদের অংশ হিসেবে মোগল আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। নদীপথে মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের ঠেকাতে মোগলরা ইছামতী-ধলেশ্বরীর মোহনার কাছে গড়ে তোলে ইদ্রাকপুর দুর্গ, যা আজও মুন্সিগঞ্জ শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।
ব্রিটিশ আমলে মুন্সিগঞ্জ ছিল ঢাকা জেলার একটি মহকুমা। ১৯৮৪ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
একাত্তরের মুন্সিগঞ্জ
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই এ জেলার মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ ছাত্র-জনতা সরকারি অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ৯ মে গজারিয়ায় পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে কয়েকশো গ্রামবাসী নিহত হন — জেলার ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিনগুলোর একটি। পরে আগস্টে মুক্তিযোদ্ধারা শ্রীনগর ও লৌহজং থানা দখল করেন, টঙ্গিবাড়ী থানায় একাধিকবার আক্রমণ চালানো হয়। রমজানের শবে কদরের রাতে মুক্তিযোদ্ধারা মুন্সিগঞ্জ শহরে বড় আক্রমণ চালান। ১১ ডিসেম্বর পুরো জেলা শত্রুমুক্ত হয়।
নদী, আলু আর হিমাগারের জনপদ
মুন্সিগঞ্জে কোনো পাহাড় নেই; বর্ষায় এর বড় অংশ পানিতে ডুবে থাকে। পদ্মা আর মেঘনা জেলার সীমানা টেনেছে, ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ধলেশ্বরী ও ইছামতী। এই নদীগুলো প্রতি বছর যে পলি রেখে যায়, তাতেই এখানকার মাটি এত উর্বর।
কৃষিই জেলার প্রধান জীবিকা, আর তার মধ্যে আলুর নাম সবার আগে আসে। শীতের মৌসুমে মাইলের পর মাইল জমিতে আলুর সবুজ সারি দেখা যায়, আর মৌসুম শেষে সেই আলু জমা হয় জেলার অসংখ্য হিমাগারে। ব্যবসা-বাণিজ্যও এখানে বড় ভরসা। গজারিয়া ও মুক্তারপুরের দিকে সিমেন্ট কারখানা, জাহাজ নির্মাণ আর নানা শিল্প গড়ে উঠেছে। লৌহজংয়ের মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর জেলার চেহারাই খানিকটা বদলে গেছে — নদী পারাপারের ঘাট যে ব্যস্ততা ধরে রাখত, সেই জায়গা এখন নিয়েছে চওড়া সড়ক।
যাঁদের শেকড় বিক্রমপুরে
উপমহাদেশের বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈতৃক বাড়ি শ্রীনগরের রাঢ়িখালে। সেখানে তাঁর নামে স্কুল-কলেজ ও স্মৃতি কমপ্লেক্স আছে। একই গ্রামে জন্মেছিলেন লেখক হুমায়ুন আজাদ। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পৈতৃক শেকড়ও বিক্রমপুরে। এমন বহু শিক্ষক, লেখক আর সংস্কারকের নাম জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের সঙ্গে, যে কারণে "বিক্রমপুরের মানুষ" কথাটার একটা আলাদা ওজন আছে।
লোকসংস্কৃতিতেও জেলাটি প্রাণবন্ত। দুর্গাপূজা, পহেলা বৈশাখ আর চৈত্রসংক্রান্তিতে যাত্রা, পালাগান, কবিগান, কীর্তন আর বাউল গানের আসর বসে। শ্যামসিদ্ধির মেলা, ঝুলনের মেলা আর রথযাত্রা আজও লোক টানে। বর্ষায় নৌকাবাইচ আর গ্রামীণ লাঠিখেলা এখানকার পুরোনো আনন্দ।
ঘুরে দেখার মতো জায়গা
মুন্সিগঞ্জে ঘোরার আনন্দ হলো এক দিনেই কয়েক শতাব্দী ছুঁয়ে আসা যায়:
- ইদ্রাকপুর দুর্গ — শহরের মাঝখানে মোগল আমলের জলদুর্গ, উঁচু গোলাকার মঞ্চটা দূর থেকেই চোখে পড়ে।
- রামপালের বাবা আদমের মসজিদ ও বল্লাল সেনের দিঘি — সুলতানি ও সেন যুগের স্মৃতি পাশাপাশি।
- সোনারংয়ের জোড়া মঠ আর শ্যামসিদ্ধির মঠ — আকাশ ছোঁয়া পুরোনো মঠ, বিক্রমপুরের মঠ-স্থাপত্যের নমুনা।
- রাঢ়িখালে জগদীশ চন্দ্র বসুর স্মৃতি কমপ্লেক্স।
- বজ্রযোগিনীতে অতীশ দীপঙ্করের স্মৃতিস্থান।
- মাওয়া প্রান্ত থেকে পদ্মার বিস্তার আর পদ্মা সেতুর দৃশ্য।
পাতক্ষীর, ইলিশ আর রসের কারিগরি
বিক্রমপুরের রান্নাঘর নদীর মতোই উদার। পদ্মা আর মেঘনার মোহনার কাছাকাছি হওয়ায় ইলিশ এখানকার খাবারের কেন্দ্রে। মাওয়া ঘাটের ইলিশ ভাজা একসময় নদী পারাপারের যাত্রীদের কাছে প্রায় রীতির মতো ছিল — গরম তেলে সদ্য ভাজা ইলিশের টুকরা, পাশে তেলে ভাজা ইলিশের লেজ, বেগুন ভাজা আর ধোঁয়া ওঠা ভাত। সেতু হওয়ার পরও নদীর পাড়ে ইলিশ খেতে যাওয়ার অভ্যাসটা পুরোপুরি হারায়নি।
তবে মুন্সিগঞ্জের সবচেয়ে নিজস্ব স্বাদের নাম পাতক্ষীর। সিরাজদিখানের কারিগরেরা দুধ দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিয়ে ঘন করেন, সঙ্গে সামান্য চিনি আর হলুদের আভা, তারপর কলাপাতায় মুড়ে বানান এই ক্ষীর। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই পদ্ধতি টিকে আছে বলে স্থানীয়রা জানান, আর সম্প্রতি এটি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে। শীতের দিনে পাতক্ষীর দিয়ে পাটিসাপটা পিঠা বানানোর চল এখানে খুব পুরোনো। জেলার মিষ্টির দোকানগুলোতে রসগোল্লারও আলাদা কদর আছে — বিয়ে, আকিকা বা অতিথি আপ্যায়নে হাঁড়িভর্তি রসগোল্লা ছাড়া চলে না।
শীতে আলুর জেলায় আলু ভর্তা আর নানা রকম আলুর তরকারি তো আছেই। কোথায় কী খাবেন, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত পাবেন মুন্সিগঞ্জের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাওয়ার পথ ও উপযুক্ত সময়
ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জ যাওয়া সহজ। সড়কপথে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ধরে লৌহজং-শ্রীনগরের দিকে, কিংবা মুক্তারপুর সেতু পেরিয়ে জেলা শহরে পৌঁছানো যায়। সদরঘাট থেকে নদীপথে লঞ্চেও মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার চল আছে। ঘোরার জন্য শীতকাল সবচেয়ে আরামদায়ক — রাস্তা শুকনো, আলুর মাঠ সবুজ, আর পাতক্ষীরের মৌসুমও তখন। ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে বর্ষার শেষভাগও মন্দ নয়।
সাধারণ প্রশ্ন
মুন্সিগঞ্জের পুরোনো নাম কী?
মুন্সিগঞ্জের প্রাচীন নাম বিক্রমপুর, আর মোগল আমলে এলাকাটি ইদ্রাকপুর নামে পরিচিত ছিল।
মুন্সিগঞ্জের সবচেয়ে বিখ্যাত খাবার কোনটি?
সিরাজদিখানের পাতক্ষীর জেলার সবচেয়ে পরিচিত খাবার, যা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। পদ্মার ইলিশ ভাজা আর রসগোল্লাও জনপ্রিয়।
মুন্সিগঞ্জে এক দিনে কী কী দেখা যায়?
ইদ্রাকপুর দুর্গ, রামপালের বাবা আদমের মসজিদ, সোনারংয়ের জোড়া মঠ আর রাঢ়িখালে জগদীশ চন্দ্র বসুর স্মৃতি কমপ্লেক্স এক দিনেই ঘুরে আসা যায়।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh