ময়মনসিংহ জেলা: গীতিকা, জমিদারবাড়ি আর মণ্ডার দেশ
ময়মনসিংহ বিভাগ · ১২টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
মহুয়া, মলুয়া, কাজলরেখা, দেওয়ানা মদিনা—এই নামগুলো যাঁরা একবার পড়েছেন, তাঁদের কাছে ময়মনসিংহ শুধু একটা জেলা নয়, একটা গল্পের ভাণ্ডার। গ্রামের গায়েনদের মুখে মুখে বেঁচে থাকা এই পালাগুলোই পরে মৈমনসিংহ গীতিকা নামে সংকলিত হয়ে বাংলা সাহিত্যে আলাদা জায়গা করে নেয়। পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের তীরে গড়ে ওঠা ময়মনসিংহ জেলা দেশের পুরোনো প্রশাসনিক জেলাগুলোর একটি, এখন একই নামের বিভাগের কেন্দ্র। এখানে জমিদারদের রাজবাড়ি, শিল্পাচার্যের নামে সংগ্রহশালা, কৃষি গবেষণার বড় প্রতিষ্ঠান আর মুক্তাগাছার মণ্ডা পাশাপাশি জায়গা নিয়ে আছে।
মোমেনশাহী থেকে ময়মনসিংহ
নামের উৎস নিয়ে একাধিক মত চালু আছে। প্রচলিত আছে, মোমেন শাহ নামে এক সাধকের নামে অঞ্চলটির নাম হয় মোমেনশাহী, আর সেখান থেকে লোকমুখে ময়মনসিংহ। আরেকটি মত বলে, ষোড়শ শতকে বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ তাঁর পুত্র নসরত শাহের জন্য এখানে একটি শাসনাঞ্চল গড়েন, তাই এলাকার নাম হয় নসরতশাহী বা নাসিরাবাদ; শহরের পুরোনো নাম নাসিরাবাদই ছিল। কেউ কেউ আবার মোগল সেনাপতি মানসিংহ বা মনমোহন সিংহের সঙ্গে নামটিকে জুড়ে দেন। কোনটি ঠিক, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে একমত নেই।
ইতিহাসের স্তর
প্রাচীনকালে এই অঞ্চল কামরূপ রাজ্যের প্রভাবে ছিল বলে ধারণা করা হয়। পরে বাংলার সুলতানি শাসন, তারপর বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম ঈসা খাঁর প্রভাব এবং শেষে মোগল শাসন এখানে বিস্তৃত হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজস্ব আদায় ও বিদ্রোহ দমনের প্রয়োজনে ১৭৮৭ সালে ময়মনসিংহ জেলা গঠন করে। তখনকার জেলাটি ছিল বিশাল; পরে এর মহকুমাগুলো একে একে জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নেত্রকোণা জেলা হিসেবে আলাদা হয়ে যায়। উনিশ শতকের শেষ দিকে রেলপথ এলে শহরের গুরুত্ব আরও বাড়ে।
মুক্তাগাছার আচার্য চৌধুরী জমিদার পরিবার এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী জমিদারদের মধ্যে ছিল। তাদের রাজবাড়ির বিশাল চত্বর, মন্দির, নাটমঞ্চ আর দিঘি এক সময় উৎসবে মুখর থাকত; দেশভাগের পর পরিবারের সদস্যরা চলে গেলে বাড়িটি ধীরে ধীরে জীর্ণ হতে থাকে।
এই সময়েই মুক্তাগাছা, গৌরীপুর ও আশপাশের জমিদার পরিবারগুলো শহরে প্রাসাদ, স্কুল আর জনহিতকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের আলেকজান্ডার ক্যাসল, যাকে স্থানীয়রা লোহার কুঠি বলেন, আর মহারাজা শশীকান্তের শশী লজ সেই যুগের নিদর্শন। প্রচলিত আছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ময়মনসিংহ সফরে এসে আলেকজান্ডার ক্যাসলে উঠেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে ময়মনসিংহ ছিল উত্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট। মার্চের শেষেই খাগডহরের ইপিআর ক্যাম্পে প্রতিরোধ শুরু হয়। হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, ত্রিশাল, নান্দাইল আর গফরগাঁওয়ে একের পর এক সংঘর্ষ ও হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটে। হালুয়াঘাটের তেলিখালীতে পাকিস্তানি ঘাঁটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বিত আক্রমণ এবং ধোবাউড়ার গোয়াতলায় গণহত্যা স্থানীয় ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।
ব্রহ্মপুত্র, গারো পাহাড় আর মাঠ
একসময়ের প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র আজ শান্ত, শীতে অনেক জায়গায় হাঁটুজলে নেমে আসে। এই পুরাতন ব্রহ্মপুত্রই শহরের প্রাণ; নদীর পাড়ে বিকেল কাটানো ময়মনসিংহবাসীর পুরোনো অভ্যাস। জেলার উত্তরে হালুয়াঘাট আর ধোবাউড়ায় গারো পাহাড়ের পাদদেশ, যার ওপারে ভারতের মেঘালয়। কংস, ভোগাই আর সুতিয়ার মতো নদী জেলার নানা অংশ দিয়ে বয়ে গেছে। দক্ষিণে ভালুকা আর ফুলবাড়িয়ার দিকে মধুপুর গড়ের লালমাটির টিলা ও শালবনের রেশ পাওয়া যায়।
ময়মনসিংহের অর্থনীতি এখনো মূলত কৃষিনির্ভর: ধান, পাট, সবজি, আর অসংখ্য পুকুরে মাছচাষ। শহরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থাকায় কৃষি ও মাছের নতুন জাত নিয়ে দেশের অনেক কাজ এখান থেকেই শুরু হয়। ভালুকার দিকে কলকারখানাও বেড়েছে।
গান, গীতিকা আর মানুষ
ময়মনসিংহের লোকসংস্কৃতি বাংলার অন্যতম সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। চন্দ্রকুমার দে গ্রাম ঘুরে যে পালাগুলো সংগ্রহ করেছিলেন, দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় সেগুলো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৈমনসিংহ গীতিকা নামে প্রকাশিত হয় এবং পরে অন্য ভাষায়ও অনূদিত হয়। বাউল, ভাটিয়ালি, কবিগান, জারি আর কীর্তন এখনো গ্রামের আসরে শোনা যায়। উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চলে গারো, হাজং ও কোচ সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের ভাষা, উৎসব ও রীতি নিয়ে বসবাস করেন। হালুয়াঘাট আর ধোবাউড়ার গারো গ্রামগুলোতে ফসল তোলার পর ওয়ানগালা উৎসবে ঢোল, নাচ আর গানে দেবতাকে নতুন ফসল নিবেদন করা হয়। গির্জা আর মিশনারি স্কুলও এই এলাকার পরিচিত দৃশ্য। সমতলের গ্রামে আবার বৈশাখী মেলা, নৌকাবাইচ আর পালাগানের আসর মানুষকে এক জায়গায় টেনে আনে।
ত্রিশালের সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে; সেখানে তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয় ও স্মৃতিকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ব্রহ্মপুত্রের তীরে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সংগ্রহশালা শহরের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র; শিল্পীর ছেলেবেলা কেটেছে এই শহরেই, আর তাঁর আঁকা ব্রহ্মপুত্রের ছবি অনেকের চেনা। ত্রিশালের মানুষ ছিলেন লেখক ও রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ, যাঁর ব্যঙ্গরচনা আজও পড়া হয়।
যেখানে যেতে পারেন
শহরের ভেতরেই একদিনে অনেকটা দেখা যায়। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা ও তার পাশের পার্ক, শশী লজ, আলেকজান্ডার ক্যাসল আর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাস ও বোটানিক্যাল গার্ডেন। একটু বাইরে গেলে মুক্তাগাছার জমিদারবাড়ি, যার ভাঙা দেয়াল আর কারুকাজে পুরোনো আভিজাত্যের ছাপ এখনো স্পষ্ট। ত্রিশালের নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র আর উত্তরে হালুয়াঘাট-ধোবাউড়ার গারো পাহাড়ের পাদদেশও ঘুরে আসার মতো।
মণ্ডা আর ময়মনসিংহের রান্নাঘর
ময়মনসিংহের মিষ্টির কথা উঠলে প্রথমেই আসে মুক্তাগাছার মণ্ডা। ছানা আর চিনি দিয়ে বানানো চ্যাপ্টা, হালকা দানাদার এই মিষ্টির উদ্ভাবক হিসেবে গোপাল পালের নাম শোনা যায়, আর তাঁর বংশধররাই প্রজন্ম ধরে পারিবারিক পদ্ধতিতে এটি বানিয়ে আসছেন। শীতে খেজুর গুড়ের মণ্ডাও মেলে। অনেকে ময়মনসিংহ এসে শুধু এই মণ্ডার বাক্স হাতে নিয়েই ফেরেন।
তবে প্রতিদিনের খাবারে জায়গা নেয় পুকুর আর নদীর মাছ। পাঙাশ, রুই, কই বা দেশি ছোট মাছ দিয়ে আলু-বেগুনের পাতলা মাছের ঝোল এখানকার ঘরোয়া রান্নার মেরুদণ্ড। শীতে চালের গুঁড়ি আর খেজুর গুড়ে ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা সহ নানা পিঠা হয়, আর এই অঞ্চলে চ্যাপা শুঁটকি দিয়েও পিঠা বানানোর চল আছে। কোন পদ কোথায় ভালো পাওয়া যায়, জানতে দেখুন ময়মনসিংহের বিখ্যাত খাবার।
যাওয়ার উপায় ও সময়
ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ সড়কপথে বাসে বা নিজস্ব গাড়িতে কয়েক ঘণ্টার পথ, আর রেলপথেও প্রতিদিন একাধিক ট্রেন চলে। শীতকাল ঘোরার জন্য সবচেয়ে ভালো: ব্রহ্মপুত্রের চরে হাঁটা যায়, পিঠার মৌসুম থাকে, আর গারো পাহাড়ের দিকের রাস্তাও তখন আরামদায়ক।
সাধারণ প্রশ্ন
ময়মনসিংহ নামটি কোথা থেকে এসেছে?
প্রচলিত আছে, মোমেন শাহ নামে এক সাধকের নামে অঞ্চলটির নাম মোমেনশাহী হয়েছিল, যা পরে ময়মনসিংহে রূপ নেয়। নাসিরাবাদ ছিল শহরের পুরোনো নাম, আর মোগল সেনাপতির নাম থেকে উৎপত্তির মতও শোনা যায়।
ময়মনসিংহ জেলা কবে গঠিত হয়?
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৮৭ সালে ময়মনসিংহ জেলা গঠন করে। এটি বাংলাদেশের পুরোনো জেলাগুলোর একটি।
মুক্তাগাছার মণ্ডা কেন বিখ্যাত?
ছানা ও চিনির এই চ্যাপ্টা মিষ্টি উদ্ভাবকের বংশধরেরা প্রজন্ম ধরে পারিবারিক পদ্ধতিতে বানিয়ে আসছেন। এর নরম দানাদার গঠন আর হালকা মিষ্টতার জন্য এটি দেশজুড়ে পরিচিত।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh