Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

নড়াইল জেলা: চিত্রার পাড়ে রং আর সুরের জনপদ

খুলনা বিভাগ · ৩টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. নড়াইল নামের তিন গল্প
  2. জমিদারবাড়ি, মহকুমা আর জেলা
  3. একাত্তরের নড়াইল
  4. চিত্রা, মধুমতী আর বিলের জীবন
  5. সুলতান, বিজয় সরকার ও সুরের ভূমি
  6. কোথায় যাবেন
  7. চিত্রার মাছ, খেজুর গুড় আর পিঠা
  8. ঢাকা থেকে যাওয়া ও উপযুক্ত সময়
  9. সাধারণ প্রশ্ন

এস এম সুলতানের আঁকা কৃষকেরা দেখতে বিশাল, পেশিবহুল, যেন মাটির ভেতর থেকে উঠে আসা দেবতা। অনেকে জানতে চান, এই মানুষগুলোকে তিনি কোথায় দেখেছিলেন। উত্তরটা খুঁজতে হলে যেতে হবে নড়াইলে, চিত্রা নদীর পাড়ে, যেখানে তিনি জন্মেছিলেন এবং জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন। খুলনা বিভাগের এই ছোট জেলাটিতে নদী, মাঠ আর মানুষের মধ্যে একটা নিবিড় বন্ধন আছে, যা সুলতানের ক্যানভাসে, বিজয় সরকারের গানে আর এখানকার নৌকাবাইচের উল্লাসে ধরা পড়ে।

নড়াইল নামের তিন গল্প

নড়াইল নামের উৎপত্তি নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না, তবে লোকমুখে তিনটি গল্প প্রচলিত আছে। প্রথম গল্পে আছেন মদনগোপাল দত্ত নামে এক ব্যক্তি, যিনি এক ফকিরের কাছ থেকে একটি লাঠি বা "নড়ি" উপহার পেয়েছিলেন, আর সেই নড়ি থেকেই জায়গাটির নাম। দ্বিতীয় গল্পটি খান জাহান আলীর আমলের। বলা হয়, তখন সীমান্তরক্ষীরা এখানে একটি বাঁধ বা "আল" তৈরি করেছিলেন, সেই "নড়ের আল" থেকে নামটি এসেছে। তৃতীয় মতে, এখানে একটি বড় পাথর সরানো বা "নড়ানো" হয়েছিল, সেই ঘটনা থেকেই নড়াইল। গল্পগুলোর সত্যতা যা-ই হোক, মদনগোপাল দত্তের নাম নড়াইলের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর বংশধরেরাই পরে এখানকার জমিদার হন।

জমিদারবাড়ি, মহকুমা আর জেলা

আঠারো শতকে মদনগোপাল দত্তের নাতি রূপরাম দত্ত নড়াইলের প্রথম জমিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। তাঁর উত্তরসূরিরা চিত্রার তীরে জমিদারবাড়ি, মন্দির আর ঘাট বানান। নড়াইলের জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় উনিশ শতকের শেষ দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ, যা এখনো জেলার প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জমিদারবাড়ির অনেকটাই এখন ভগ্নদশায়, তবু ঘাটের সিঁড়ি আর পুরোনো দালান সেই সময়ের কথা বলে।

এর আগের ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে রয়েছে গোয়ালবাথান মসজিদ, যা ১৬৫৪ সালে নির্মিত বলে জানা যায়, অর্থাৎ মুঘল আমলের। ১৮৬১ সালে যশোর জেলার অধীনে নড়াইল মহকুমা গঠিত হয়। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ নড়াইল পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত হয়।

একাত্তরের নড়াইল

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই নড়াইলের তরুণেরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। মার্চের শেষে স্থানীয় নেতৃত্বে নড়াইলের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এপ্রিলের শুরুতে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালান, এরপর পাকিস্তানি সেনারা নড়াইল শহরে ঢুকে ক্যাম্প স্থাপন করে। লোহাগড়ার ইতনা গ্রামে মে মাসে এক দিনে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়, সেখানে ও শহরের পানি উন্নয়ন বোর্ড চত্বরে গণকবর চিহ্নিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর নড়াইল শত্রুমুক্ত হয়।

এই জেলার মহিষখোলা গ্রামে জন্মেছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ। একাত্তরের সেপ্টেম্বরে যশোরের গোয়ালহাটিতে সহযোদ্ধাদের রক্ষা করতে গিয়ে তিনি শহীদ হন। তাঁর জন্মগ্রামে এখন তাঁর নামে স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার রয়েছে।

চিত্রা, মধুমতী আর বিলের জীবন

নড়াইলের প্রাণ চিত্রা নদী। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদীর পাড়ে বিকেলে হাঁটা, ঘাটে বসে নৌকা দেখা শহরবাসীর প্রিয় অবসর। জেলার পূর্ব সীমানা দিয়ে বয়ে গেছে মধুমতী, তার ওপর কালনা এলাকায় নির্মিত সেতু এখন ঢাকা-যশোর সড়কপথের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নবগঙ্গা আর ভৈরবও জেলার মধ্য দিয়ে গেছে, আর আছে অনেকগুলো বিল।

এখানকার বেশির ভাগ মানুষ কৃষিজীবী। ধান, পাট, গম, তেলবীজ, আখ আর ডাল প্রধান ফসল, বাড়ির আশপাশে আম, কাঁঠাল, নারকেল আর সুপারির গাছ। বর্ষায় বিলগুলো পানিতে ডুবে গেলে মাছ ধরা হয়ে ওঠে বহু পরিবারের প্রধান কাজ। তখন বিলজুড়ে শাপলা ফোটে, ডিঙি নৌকায় চড়ে মানুষ হাটে যায়, আর গ্রামগুলো যেন পানির ওপর ভেসে থাকা ছোট ছোট দ্বীপ হয়ে ওঠে। শীতে মাঠের আল ধরে সারি সারি খেজুর গাছ, তাতে গাছিদের ঝোলানো হাঁড়ি।

সুলতান, বিজয় সরকার ও সুরের ভূমি

শিল্পী এস এম সুলতানের জন্ম ১৯২৩ সালে নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে। দেশ-বিদেশ ঘুরে শেষ জীবনে তিনি নড়াইলেই ফিরে আসেন, চিত্রার পাড়ে শিশুদের জন্য গড়েন "শিশুস্বর্গ", নদীতে ভাসান শিশুদের জন্য বানানো একটি বড় নৌকা। তাঁর বাড়ি এখন সংগ্রহশালা, পাশে তাঁর সমাধি। তাঁর স্মরণে আয়োজিত সুলতান মেলায় চিত্রায় নৌকাবাইচ হয়, নদীর দুই পাড়ে হাজারো মানুষ জড়ো হন।

লোককবি ও গায়ক বিজয় সরকারের জন্ম নড়াইলের ডুমদি গ্রামে। তাঁর বিচ্ছেদি গান আর কবিগান এখনো বাংলার গ্রামে গ্রামে গাওয়া হয়। জারি, কীর্তন, ভাটিয়ালি আর মেয়েলি গীতের ধারাও এখানে সমৃদ্ধ। কালিয়া উপজেলাকে নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্কর ও সেতারবাদক রবিশঙ্করের পৈতৃক ভিটা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিলের দেশ বলে নৌকাবাইচ, কাবাডি আর গ্রামীণ খেলাধুলা নড়াইলের উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কোথায় যাবেন

  • চিত্রার পাড়ে এস এম সুলতানের বাড়ি, সংগ্রহশালা, সমাধি ও শিশুস্বর্গ
  • নড়াইল জমিদারবাড়ি ও চিত্রার ঘাট
  • ১৬৫৪ সালের গোয়ালবাথান মসজিদ
  • জোড়বাংলার রাধাগোবিন্দ মন্দির ও উজিরপুরে রাজা কেশব রায়ের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ
  • মহিষখোলায় বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের স্মৃতি জাদুঘর
  • মধুমতী নদী ও কালনার সেতু এলাকা

চিত্রার মাছ, খেজুর গুড় আর পিঠা

নড়াইলের রান্নাঘর নদীর ওপর নির্ভর করে। চিত্রা আর মধুমতী থেকে আসা রুই, বোয়াল, আইড়, চিংড়ি আর বিলের কই, শিং, মাগুর, টাকি এখানকার পাতের চেনা মুখ। গৃহস্থ বাড়িতে মাছের ঝোল হয় হালকা মসলায়, কখনো লাউ বা কাঁচকলা দিয়ে, যাতে নদীর মাছের নিজস্ব স্বাদ ঢেকে না যায়। বর্ষায় ইলিশ এলে সর্ষে বাটায় রাঁধা হয়, আর ছোট মাছের চচ্চড়ি তো প্রায় প্রতিদিনের।

শীতে নড়াইলের গাছিরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ভোরের খেজুর রস জ্বাল দিয়ে হয় ঝোলা গুড় আর পাটালি, যা হাটে উঠলেই বিক্রি হয়ে যায়। নতুন গুড় দিয়ে বানানো হয় ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা আর রসে ডোবানো পিঠা। পৌষ সংক্রান্তি আর নবান্নে পিঠার উৎসব হয় পাড়ায় পাড়ায়, আর সুলতান মেলার মাঠেও পিঠার দোকান বসে। নড়াইলের খাবার নিয়ে আরও জানতে পড়ুন নড়াইলের বিখ্যাত খাবার।

ঢাকা থেকে যাওয়া ও উপযুক্ত সময়

ঢাকা থেকে নড়াইলে সড়কপথে বাস চলে, পদ্মা সেতু ও মধুমতী সেতু হয়ে যাত্রা এখন অনেক সংক্ষিপ্ত। পদ্মা সেতুর রেলপথও নড়াইল হয়ে যশোরের দিকে গেছে, ফলে রেলে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি বেড়ানোর সবচেয়ে ভালো সময়, তখন খেজুর রসের মৌসুম আর চিত্রার পাড়ে বিকেলগুলোও মনোরম। বর্ষার শেষে গেলে নৌকাবাইচ দেখার সুযোগ মিলতে পারে। শহরে থাকার জন্য সাধারণ মানের হোটেল আছে, আর এক দিনেই সুলতানের বাড়ি ও চিত্রার পাড় ঘুরে দেখা যায়।

সাধারণ প্রশ্ন

নড়াইল কেন বিখ্যাত?

নড়াইল চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, লোককবি বিজয় সরকার ও বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের জন্মস্থান, এবং চিত্রা নদী ও নৌকাবাইচের জন্য পরিচিত।

এস এম সুলতানের বাড়ি কোথায়?

নড়াইল শহরের কাছে চিত্রা নদীর পাড়ে এস এম সুলতানের বাড়ি, সংগ্রহশালা ও সমাধি রয়েছে। তাঁর জন্ম মাছিমদিয়া গ্রামে।

নড়াইল কবে জেলা হয়?

নড়াইল ১৮৬১ সালে যশোরের অধীনে মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত হয়।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

নড়াইলের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ নড়াইলের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 খুলনা বিভাগের অন্য জেলা