Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

নারায়ণগঞ্জ জেলা: নদীবন্দর, সোনারগাঁও ও জামদানির জনপদ

ঢাকা বিভাগ · ৫টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. নারায়ণের নামে এক বাজার
  2. সোনারগাঁও: বাংলার পুরোনো রাজধানী
  3. পাটের যুগ ও প্রাচ্যের ড্যান্ডি
  4. একাত্তরের ক্ষত
  5. ছয় নদীর জেলা
  6. জামদানি, লোকশিল্প আর অষ্টমী স্নান
  7. যা দেখবেন
  8. নদীবন্দরের রান্নাঘর
  9. কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন
  10. সাধারণ প্রশ্ন

শীতলক্ষ্যার পাড়ে দাঁড়ালে নারায়ণগঞ্জকে বোঝা সহজ হয়। নদীতে বালুবোঝাই বাল্কহেড, ওপারে কারখানার চিমনি, ঘাটে খেয়ার মাঝির হাঁকডাক — সব মিলে একটা অবিরাম ব্যস্ততা। অথচ এই শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই সোনারগাঁও, যেখানে একসময় বাংলার স্বাধীন সুলতানদের দরবার বসত। নারায়ণগঞ্জ জেলা তাই দুই সময়ের গল্প একসঙ্গে বলে: মধ্যযুগের রাজধানী আর ঔপনিবেশিক যুগের বাণিজ্যিক বন্দর। ঢাকার দক্ষিণ-পূর্বে পাঁচটি উপজেলা — নারায়ণগঞ্জ সদর, বন্দর, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার আর সোনারগাঁও — নিয়ে গড়া এই জেলা আয়তনে ঢাকা বিভাগের সবচেয়ে ছোট, কিন্তু জনবসতি ও কর্মচাঞ্চল্যে অন্যতম ঘন।

নারায়ণের নামে এক বাজার

নামের গল্পটা শুরু হয় অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি। প্রচলিত আছে, ১৭৬৬ সালের দিকে লক্ষ্মীনারায়ণ ঠাকুর — যিনি বিকন লাল পান্ডে বা বেণুর ঠাকুর নামেও পরিচিত — শীতলক্ষ্যার তীরের এই এলাকার মালিকানা পান। তিনি নদীর পাড়ের বাজারটি দেবতা নারায়ণের সেবার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। সেই থেকে বাজারের নাম নারায়ণগঞ্জ, আর বাজার ঘিরে গড়ে ওঠা শহরও এই নামেই পরিচিত হয়।

সোনারগাঁও: বাংলার পুরোনো রাজধানী

নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসের গভীরতম স্তরটি সোনারগাঁওয়ে। সুলতানি আমলে সোনারগাঁও ছিল পূর্ববাংলার প্রধান প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানকার মোগরাপাড়ায় সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি আছে বলে ধারণা করা হয় — যে সুলতানের নাম পারস্যের কবি হাফিজের সঙ্গে পত্রালাপের কিংবদন্তির জন্যও পরিচিত। ষোড়শ শতকের শুরুতে নির্মিত গোয়ালদী মসজিদ এখনো সুলতানি স্থাপত্যের সূক্ষ্ম পোড়ামাটির কাজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মোগলরা যখন বাংলায় আধিপত্য বিস্তার করছিল, তখন বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁ সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরে মোগল সুবেদারেরা নদীপথে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের ঠেকাতে শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে দুর্গ গড়েন — হাজীগঞ্জ দুর্গ (স্থানীয়ভাবে ঈসা খাঁর কেল্লা নামেও ডাকা হয়) আর বন্দরের সোনাকান্দা দুর্গ। এই দুটি জলদুর্গ আজও টিকে আছে, ইটের প্রাচীর আর কামান বসানোর উঁচু মঞ্চসহ।

পাটের যুগ ও প্রাচ্যের ড্যান্ডি

ব্রিটিশ আমলে নারায়ণগঞ্জের গুরুত্ব বাড়ে নদীবন্দর হিসেবে। ১৮৭৬ সালে এখানে পৌরসভা হয়, ১৮৮২ সালে মহকুমা। পূর্ববাংলার পাট নদীপথে এসে জমা হতো শীতলক্ষ্যার পাড়ের গুদামে, তারপর প্রক্রিয়াজাত হয়ে চলে যেত বিদেশে। এত পাটের ব্যবসার কারণে শহরটিকে স্কটল্যান্ডের পাটশিল্প নগরীর নামে "প্রাচ্যের ড্যান্ডি" বলা হতো। কলকাতা থেকে রেলে গোয়ালন্দ এসে স্টিমারে নারায়ণগঞ্জ — এই পথেই একসময় ঢাকার যাত্রীরা যাতায়াত করতেন।

স্বাধীনতার পর আদমজী পাটকল দীর্ঘদিন দেশের সবচেয়ে বড় পাটকল হিসেবে পরিচিত ছিল। পাটের সেই সোনালি দিন এখন অতীত; তার জায়গায় এসেছে নিট পোশাক, হোসিয়ারি, আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল আর কাঁচপুরের শিল্প এলাকা। ১৯৮৪ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা হয়, আর ২০১১ সালে গঠিত হয় সিটি করপোরেশন।

একাত্তরের ক্ষত

মুক্তিযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ ছিল দুই নম্বর সেক্টরের অধীনে। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ সদরের উত্তর চাষাঢ়ায় পাকিস্তানি সেনারা অতর্কিত হামলা চালায়। ৩ এপ্রিল বন্দর উপজেলায় অর্ধশতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়। ২৯ নভেম্বর বুড়িগঙ্গার তীরে বক্তাবলীর চরে শতাধিক গ্রামবাসীকে গুলি করে মারা হয়, যা আজ বক্তাবলী গণহত্যা নামে স্মরণ করা হয়। সোনারগাঁওয়ের কয়েকটি গ্রামেও গণহত্যার চিহ্ন রয়ে গেছে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন স্থানে রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ চালিয়ে প্রতিরোধ জারি রেখেছিলেন।

ছয় নদীর জেলা

শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, বুড়িগঙ্গা, বালু আর ধলেশ্বরী — এই ছয় নদী নারায়ণগঞ্জকে ঘিরে রেখেছে। শহর ও রূপগঞ্জের বাইরে, বিশেষ করে আড়াইহাজার ও সোনারগাঁওয়ের গ্রামে এখনো কৃষিই প্রধান জীবিকা। মেঘনার চরে ধান, সবজি আর মাছের চাষ হয়।

জামদানি, লোকশিল্প আর অষ্টমী স্নান

নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে সূক্ষ্ম পরিচয় বোধহয় জামদানি। রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁওয়ের তাঁতঘরে বসে কারিগরেরা হাতে গুনে গুনে সুতা তুলে নকশা ফোটান; একটি শাড়ি বুনতে কখনো কয়েক মাস লেগে যায়। শীতলক্ষ্যার আর্দ্র বাতাস এই সূক্ষ্ম বুননের জন্য উপযোগী বলে পুরোনো তাঁতিরা বিশ্বাস করেন। জামদানি বুননের ঐতিহ্য ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

সোনারগাঁওয়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন দেশের লোকশিল্পের বড় সংগ্রহশালা। প্রতি বছর এখানে লোক ও কারুশিল্প মেলা বসে, যেখানে নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প, কাঠের পুতুল আর শীতলপাটির কারিগরেরা নিজেদের কাজ নিয়ে আসেন।

চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রে পুণ্যস্নানে দেশ-বিদেশ থেকে লাখো সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ আসেন। নদীর ঘাটে তখন ভোর থেকে ভিড়, ফুল-বেলপাতা আর উলুধ্বনিতে পুরো এলাকা অন্য রকম হয়ে ওঠে।

যা দেখবেন

  • পানাম নগর — সোনারগাঁওয়ের পুরোনো সড়কের দুই পাশে উনিশ শতকের বণিকদের সারি সারি দোতলা-তিনতলা বাড়ি, এখন জীর্ণ কিন্তু মোহময়।
  • লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, সোনারগাঁও — বড় সরদার বাড়ির ভবনে সাজানো সংগ্রহ।
  • গোয়ালদী মসজিদ ও গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি।
  • হাজীগঞ্জ দুর্গ ও সোনাকান্দা দুর্গ — শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ের মোগল জলদুর্গ।
  • বিবি মরিয়মের সমাধি ও মসজিদ, নারায়ণগঞ্জ সদর।

নদীবন্দরের রান্নাঘর

বন্দরনগরী মানে নানা জায়গার মানুষের আনাগোনা, আর তার ছাপ পড়েছে নারায়ণগঞ্জের খাবারে। শহরের পুরোনো এলাকায় বিরিয়ানির দোকানগুলো দুপুর থেকেই ভিড়ে জমজমাট থাকে — খাসি বা মুরগির মাংস, সুগন্ধি চাল আর আলুর টুকরায় রান্না বিরিয়ানি এখানে উৎসব থেকে শুরু করে সাধারণ দুপুরের খাবারেরও অংশ। ঢাকার ঘরানার কাছাকাছি হলেও স্থানীয় দোকানিরা নিজেদের মসলার মাপ নিয়ে গর্ব করেন।

নদীর জেলায় মাছের ঝোল প্রতিদিনের খাবার। মেঘনা আর শীতলক্ষ্যার মাছ — রুই, আইড়, বোয়াল, চিংড়ি — হালকা ঝোলে আলু আর বেগুন দিয়ে রান্না হয়। শিল্পাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের দিন শুরু হয় ঘাট আর কারখানার গেটের পাশের চায়ের দোকানে; কনডেন্সড মিল্কে ঘন করা দুধ চা আর একটা বনরুটি অনেকের সকালের নাশতা। সোনারগাঁওয়ের মেলার মৌসুমে মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা আর খইয়ের পসরাও চোখে পড়ে।

ইতিহাসের এক মজার সূত্রও আছে: গোয়ালন্দ থেকে নারায়ণগঞ্জগামী স্টিমারে মাঝিদের রান্না করা ঝাল মুরগির ঝোল নাকি যাত্রীদের এতই প্রিয় ছিল যে পরে তা "স্টিমারের মুরগির ঝোল" নামে খ্যাতি পায়। জেলার খাবার নিয়ে আরও জানতে দেখুন নারায়ণগঞ্জের বিখ্যাত খাবার।

কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন

ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সবচেয়ে কাছের জেলাগুলোর একটি। সড়কপথে বাস বা ব্যক্তিগত গাড়িতে যাওয়া যায়, কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত কমিউটার ট্রেনও চলে। সোনারগাঁও যেতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে মোগরাপাড়া হয়ে যাওয়াই সুবিধাজনক। শীতকাল ঘোরার জন্য সবচেয়ে ভালো, আর লোকশিল্প মেলার সময় সোনারগাঁও সবচেয়ে জমজমাট থাকে।

সাধারণ প্রশ্ন

নারায়ণগঞ্জ নামটি কীভাবে এল?

প্রচলিত আছে, অষ্টাদশ শতকে লক্ষ্মীনারায়ণ ঠাকুর শীতলক্ষ্যার পাড়ের বাজারটি দেবতা নারায়ণের নামে উৎসর্গ করেন, সেখান থেকেই নারায়ণগঞ্জ নামের উৎপত্তি।

নারায়ণগঞ্জকে প্রাচ্যের ড্যান্ডি বলা হয় কেন?

ব্রিটিশ আমলে পাট ব্যবসা ও পাটকলের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় স্কটল্যান্ডের পাটশিল্প নগরী ড্যান্ডির নামে নারায়ণগঞ্জকে এই উপাধি দেওয়া হয়।

সোনারগাঁওয়ে কী কী দেখার আছে?

পানাম নগর, লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, গোয়ালদী মসজিদ আর গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি সোনারগাঁওয়ের প্রধান দর্শনীয় স্থান।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

নারায়ণগঞ্জের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ নারায়ণগঞ্জের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 ঢাকা বিভাগের অন্য জেলা