নরসিংদী জেলা: প্রাচীন দুর্গনগর থেকে তাঁতের রাজধানী
ঢাকা বিভাগ · ৬টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
বিশ শতকের তিরিশের দশকে বেলাবোর উয়ারী গ্রামের মাটি থেকে উঠে আসা পুরোনো মুদ্রা আর পুঁতি নজর কেড়েছিল স্থানীয় স্কুলশিক্ষক হানিফ পাঠানের। তিনি সেগুলো সংগ্রহ শুরু করলেন, পরে তাঁর ছেলে হাবিবুল্লা পাঠান সেই কাজ এগিয়ে নিলেন। কয়েক দশক পর নিয়মিত খননে বেরিয়ে এল এক প্রাচীন দুর্গনগর — উয়ারী-বটেশ্বর। নরসিংদী জেলার গল্প তাই শুরু হয় প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, যদিও আজকের নরসিংদীকে মানুষ চেনে তাঁতের খটখট আওয়াজ, ব্যস্ত কাপড়ের হাট আর মৌসুমি ফলের ঝুড়ি দিয়ে। ঢাকার উত্তর-পূর্বে ছয়টি উপজেলা — নরসিংদী সদর, রায়পুরা, শিবপুর, মনোহরদী, বেলাবো ও পলাশ — নিয়ে এই জেলা।
মাটির নিচের নগর
উয়ারী-বটেশ্বর পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের তীরে অবস্থিত। এখানে প্রায় ছয়শো মিটার বাই ছয়শো মিটারের একটি দুর্গবেষ্টিত এলাকা পাওয়া গেছে, চারদিকে মাটির প্রাচীর আর পরিখা। পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে কয়েক কিলোমিটার লম্বা আরেকটি মাটির প্রাচীর আছে, স্থানীয়ভাবে যার নাম "অসম রাজার গড়"। খননে মিলেছে ছাপাঙ্কিত রুপার মুদ্রা, দামি পাথর ও কাচের পুঁতি, এমনকি দুই স্তরের কাচের মাঝে সোনার পাত বসানো বিশেষ ধরনের পুঁতি।
এসব নিদর্শন থেকে গবেষকেরা ধারণা করেন, জায়গাটি ছিল একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র। কোনো কোনো প্রত্নতত্ত্ববিদ মনে করেন, দ্বিতীয় শতকের গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমি যে "সৌনাগড়া" নামের বাণিজ্যকেন্দ্রের কথা লিখেছিলেন, সেটি হয়তো এই উয়ারী-বটেশ্বরই। বিষয়টি এখনো গবেষণার পর্যায়ে, তবে এটুকু নিশ্চিত যে বাংলাদেশের নগর-ইতিহাসের সূচনা নিয়ে ভাবতে গেলে নরসিংদীর এই গ্রামগুলোকে বাদ দেওয়া যায় না।
আজ উয়ারী আর বটেশ্বর গ্রামে গেলে প্রথম দেখায় মনে হবে সাধারণ গ্রাম — ধানখেত, বাঁশঝাড়, মাটির পথ। কিন্তু খননের জায়গাগুলোতে দাঁড়ালে চোখে পড়ে ইটের সারি, পুরোনো রাস্তার চিহ্ন আর মাটির নানা স্তর। স্থানীয় অনেক পরিবার বহু বছর ধরে চাষের সময় মাটি থেকে পুঁতি আর মৃৎপাত্রের টুকরা কুড়িয়ে পেয়েছে; গ্রামের শিশুরাও তাই এখানে ইতিহাসের সঙ্গে বেড়ে ওঠে।
নরসিংহপুর থেকে নরসিংদী
নামের উৎস নিয়ে প্রচলিত আছে, পঞ্চদশ শতকের শুরুর দিকে রাজা নরসিংহ নামে এক শাসক ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম তীরে নরসিংহপুর নামে একটি নগর পত্তন করেন। কালক্রমে মানুষের মুখে মুখে নরসিংহপুর বদলে হয়েছে নরসিংদী। মধ্যযুগে এলাকাটি মহেশ্বরদী পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল, আর এই পরগনার সঙ্গে বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁর নাম জড়িয়ে আছে।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে নরসিংদী ছিল বৃহত্তর ঢাকা জেলার অংশ। ১৯৭৭ সালে এটি মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালে জেলার মর্যাদা পায়।
যুদ্ধের দিনগুলো
১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা নরসিংদী শহরে রকেট হামলা চালায়; শতাধিক দোকান আগুনে পুড়ে যায়। জুলাইয়ে বেলাবোর কাছে সম্মুখযুদ্ধে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। শিবপুরের পুটিয়ায় এক লড়াইয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর একজন ক্যাপ্টেনসহ কয়েকজন সেনা নিহত হয়। মনোহরদী হাই স্কুলের সেনাক্যাম্পেও মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালান। ১২ ডিসেম্বর নরসিংদী শত্রুমুক্ত হয়।
রায়পুরার রামনগরে আছে বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের পৈতৃক বাড়ি, যেখানে তাঁর স্মৃতিতে একটি জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে।
তাঁতের খটখট, বাবুরহাটের ভিড়
নরসিংদীর অর্থনীতির হৃদয় তাঁত আর কাপড়। মাধবদী ও আশপাশের গ্রামে বহু প্রজন্ম ধরে তাঁত চলে; এখন হস্তচালিত তাঁতের পাশাপাশি যন্ত্রচালিত তাঁত আর বস্ত্রকলও গড়ে উঠেছে। শেখেরচরের বাবুরহাট দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি কাপড়ের বাজার হিসেবে পরিচিত। হাটবারে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকারেরা আসেন, গাঁট গাঁট কাপড় ওঠে ট্রাকে — শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস, বিছানার চাদর।
পলাশের ঘোড়াশালে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র আর সার কারখানা জেলাকে জাতীয় শিল্প-মানচিত্রে জায়গা দিয়েছে। শিবপুরে প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রও আবিষ্কৃত হয়েছে। তবু জেলার বড় অংশের মানুষের জীবিকা এখনো কৃষিনির্ভর। মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, আড়িয়াল খাঁ আর পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের পলিতে ধান, পাট, সবজি আর নানা ফল ফলে। রায়পুরার মেঘনার চরাঞ্চল আর শিবপুর-বেলাবোর লালচে উঁচু মাটি — দুই রকম ভূপ্রকৃতি এক জেলায় পাশাপাশি।
মানুষ ও সংস্কৃতি
নরসিংদীর মাটিতে জন্মেছেন ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন, যিনি পবিত্র কোরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদের জন্য স্মরণীয়। কবি শামসুর রাহমানের পৈতৃক নিবাস রায়পুরায়, আর তাঁর কবিতায় মেঘনাপাড়ের গ্রামের ছবি বারবার ফিরে এসেছে। তাঁতপল্লির জীবনেরও নিজস্ব একটা ছন্দ আছে। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত তাঁতঘরে কাজ চলে, পরিবারের নারীরা চরকায় সুতা জড়ান, ছেলেরা মাকু চালানো শেখে বড়দের পাশে বসে। হাটের আগের রাতে কাপড় ভাঁজ করে গাঁট বাঁধার ব্যস্ততা যেন ছোটখাটো উৎসব। জামাইষষ্ঠী, ভাইফোঁটা আর পুণ্যাহের মতো লোকাচার এখানকার গ্রামীণ জীবনে এখনো সজীব।
ঘোরার জায়গা
নরসিংদী সাধারণত এক দিনের ভ্রমণের জেলা, তবে দেখার জায়গা কম নয়। বেলাবোর উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নস্থান প্রথম গন্তব্য হওয়া উচিত। পলাশের ঘোড়াশালে আছে দেশের প্রথম দোতলা রেলস্টেশন বলে পরিচিত স্টেশনটি। রায়পুরার রামনগরে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতি জাদুঘর, শিবপুরের পারুলিয়া শাহী মসজিদ আর শিবপুরের লাল মাটির টিলা-বনভূমি ঘুরে দেখা যায়। ফেরার পথে মাধবদী বা বাবুরহাটে কাপড়ের হাটের জমজমাট চেহারা দেখাও এক অভিজ্ঞতা।
লটকনের মৌসুম, কলার কাঁদি
নরসিংদীর খাবারের কথা উঠলে প্রথমে আসে ফল। বর্ষার শুরুতে শিবপুর, বেলাবো আর রায়পুরার বাগানে লটকন পাকে — গাছের গুঁড়ি থেকে ডাল পর্যন্ত থোকায় থোকায় হলুদ ফল ঝুলে থাকে, যেন কেউ সাজিয়ে রেখেছে। টক-মিষ্টি এই ফল উৎপাদনে নরসিংদী দেশের শীর্ষে, আর মৌসুমে এখান থেকে ট্রাকভর্তি লটকন যায় দেশের নানা শহরে।
কলা এ জেলার সবচেয়ে পরিচিত ফল। শিবপুর ও আশপাশের এলাকায় বিস্তৃত কলাবাগান চোখে পড়ে, আর সাগর কলার মতো পাকা কলা সারা বছরই হাটে-বাজারে মেলে। সকালে মুড়ি আর পাকা কলা, কিংবা দুধ-ভাতে কলা চটকে খাওয়া — এমন সরল খাবারই এখানকার অনেক ঘরের রোজকার চেনা স্বাদ।
মেঘনার জেলা বলে মাছের ঝোলও এখানকার খাবারের মূল সুর। রায়পুরার চরাঞ্চলের হাটে মেঘনার টাটকা মাছ ওঠে; সেই মাছ আলু-বেগুন আর কাঁচা মরিচ দিয়ে পাতলা ঝোলে রান্না হয়। শীতে নতুন ধানের চালের পিঠা আর খেজুরের গুড়ও গ্রামের রান্নাঘরে ফিরে আসে। জেলার আরও খাবারের খোঁজ পাবেন নরসিংদীর বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাওয়ার উপায় ও সেরা সময়
ঢাকা থেকে নরসিংদী সড়কপথে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে সহজেই যাওয়া যায়। রেলপথেও যোগাযোগ ভালো — ঢাকা থেকে সিলেট, চট্টগ্রাম ও কিশোরগঞ্জগামী অনেক ট্রেন নরসিংদী স্টেশনে থামে। লটকন খেতে চাইলে বর্ষার শুরু, অর্থাৎ আষাঢ়-শ্রাবণ, সেরা সময়। আর প্রত্নস্থান ঘুরতে চাইলে শুকনো শীতকালই আরামদায়ক।
সাধারণ প্রশ্ন
উয়ারী-বটেশ্বর কোথায় এবং কেন বিখ্যাত?
উয়ারী-বটেশ্বর নরসিংদীর বেলাবো উপজেলায় অবস্থিত প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো একটি দুর্গনগরের প্রত্নস্থান, যেখানে ছাপাঙ্কিত রুপার মুদ্রা ও নানা রকম পুঁতি পাওয়া গেছে।
নরসিংদীর কোন ফল সবচেয়ে বিখ্যাত?
নরসিংদী লটকন উৎপাদনে দেশের শীর্ষে, আর কলাও এ জেলার সবচেয়ে পরিচিত ফলগুলোর একটি।
বাবুরহাট কী?
বাবুরহাট নরসিংদীর শেখেরচরে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি কাপড়ের বাজার, যেখানে সারা দেশ থেকে পাইকারেরা কাপড় কিনতে আসেন।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh