পিরোজপুর জেলা: সন্ধ্যা নদীর পাড়ে সবুজের জনপদ
বরিশাল বিভাগ · ৭টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
নেছারাবাদের সন্ধ্যা নদীর পাড়ে দাঁড়ালে চোখে পড়ে অদ্ভুত এক দৃশ্য: নদীর পাড় জুড়ে সারি সারি চারাগাছ, টবে টবে আম, লিচু, পেয়ারা আর ফুলের চারা, নৌকায় বোঝাই হয়ে সেগুলো চলেছে দেশের নানা প্রান্তে। আরেকটু ভেতরে ঢুকলে খালের দুই পাশে পেয়ারার বাগান, আর বর্ষায় সেই খালের ওপর বসে ডিঙি নৌকার হাট। পিরোজপুর (Pirojpur) জেলা এমনই সবুজ, নদীঘেরা আর পরিশ্রমী মানুষের জনপদ। বলেশ্বর নদী এর পশ্চিম সীমানা ঘেঁষে বয়ে গেছে, ওপারে সুন্দরবনের দিকের জেলা বাগেরহাট।
নামের পেছনে ফিরোজের গল্প
পিরোজপুরের নামের উৎস নিয়ে কয়েকটি মত আছে, তবে স্থানীয়ভাবে যে ব্যাখ্যাটি সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে ধরা হয়, তা সরদার পরিবারের ফিরোজ উদ্দিন সরদারকে নিয়ে। প্রচলিত আছে, আঠারো শতকের মাঝামাঝি তাঁর মৃত্যুর পর এলাকাটি ফিরোজপুর নামে পরিচিতি পায়, আর লোকমুখে উচ্চারণ বদলে হয়ে যায় পিরোজপুর। এলাকার পুরোনো মৌজার নাম, যেমন ফিরোজপুর, সরদারপাড়া, সরদারের বাজার, এই ব্যাখ্যার পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
অন্য কিছু জনশ্রুতি নামটিকে মোগল আমলের কোনো ফিরোজ নামধারী ব্যক্তির সঙ্গে জুড়ে দেয়। তবে এসব গল্পের কোনোটির পক্ষেই লিখিত প্রমাণ মেলে না। জেলার বাসিন্দাদের অনেক সময় 'ফিরোজপুরী' বলা হয়, যা নামের পুরোনো রূপটিকে মনে করিয়ে দেয়।
বিদ্রোহ, জমিদারি আর একাত্তর
পিরোজপুর অঞ্চল ইতিহাসে বরাবর বাকেরগঞ্জ বা বৃহত্তর বরিশালের অংশ ছিল। ব্রিটিশ আমলে ভান্ডারিয়ার সিংখালীতে কৃষকদের এক বিদ্রোহ দক্ষিণবঙ্গের প্রথম দিকের প্রতিরোধগুলোর একটি হিসেবে স্মরণ করা হয়। ১৮৮৬ সালে পিরোজপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ অঞ্চলের জমিদারবাড়িগুলো, যেমন রায়েরকাঠি আর পাড়েরহাটের জমিদারবাড়ি, সেই আমলের সমৃদ্ধির সাক্ষী। ১৯৮৪ সালে পিরোজপুর পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
মুক্তিযুদ্ধে পিরোজপুর ছিল ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে। ১৯৭১ সালের মার্চে এখানকার মানুষ অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মে মাসের শুরুতে পাকিস্তানি বাহিনী শহরে ঢোকে, শুরু হয় হত্যা আর অগ্নিসংযোগ। বলেশ্বর নদীর খেয়াঘাট পরিণত হয় বধ্যভূমিতে, যেখানে আজ স্মৃতিস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে বীরাঙ্গনা ভাগীরথীর কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের খবর পৌঁছে দেওয়ার অপরাধে যাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। আটঘর-কুড়িয়ানার পেয়ারা বাগানে চালানো গণহত্যা এই জেলার সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতিগুলোর একটি। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর পিরোজপুর শত্রুমুক্ত হয়।
নদী, নার্সারি আর বাগানের অর্থনীতি
পিরোজপুরের প্রধান নদী বলেশ্বর, কচা, সন্ধ্যা আর কালীগঙ্গা। পলিমাটির এই জেলায় ধান প্রধান ফসল, তবে মানুষের আয়ের বড় অংশ আসে বাগান থেকে। পেয়ারা, আমড়া, নারকেল, সুপারি আর কলার বাগান জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে আছে।
পেয়ারা চাষের পদ্ধতিটাও চোখে পড়ার মতো। জমিতে লম্বা লম্বা নালা কেটে মাঝের উঁচু অংশে গাছ লাগানো হয়, ফলে জোয়ারের পানি নালায় ঢোকে কিন্তু গাছের গোড়া ডোবে না। এই নালাগুলোই আবার নৌকা চলার পথ। মৌসুমে চাষিরা ভোরে ডিঙিতে পেয়ারা তুলে হাটে নিয়ে যান, সেখান থেকে পাইকারের ট্রলার বা ট্রাকে সেগুলো পৌঁছে যায় ঢাকাসহ দেশের নানা শহরে। একটি মৌসুমের ফলনের ওপর বহু পরিবারের সারা বছরের হিসাব নির্ভর করে।
নেছারাবাদ, যার পুরোনো ও বহুল পরিচিত নাম স্বরূপকাঠি, দেশজুড়ে নার্সারির জন্য বিখ্যাত। সন্ধ্যা নদীর পাড়ে শত শত নার্সারিতে চারা তৈরি হয়, আর নদীপথে সেগুলো ছড়িয়ে পড়ে। স্বরূপকাঠির কাঠের হাট আর নৌকা তৈরির ঐতিহ্যও পুরোনো। নাজিরপুরের নিচু জলাভূমিতে ভাসমান বেডে সবজি চাষের পদ্ধতিও এই অঞ্চলের এক উদ্ভাবনী কৃষি ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত।
মানুষ ও লোকসংস্কৃতি
পিরোজপুরের মাটি দেশের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে বড় নাম দিয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জন্ম ভান্ডারিয়ায়। কবি আহসান হাবীবের জন্মও পিরোজপুরের শংকরপাশা গ্রামে। শিক্ষার ইতিহাসও এখানে পুরোনো। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, পিরোজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ১৮৯৩ সালে এবং সরকারি বালক বিদ্যালয় ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মফস্বলের একটি শহরে উনিশ শতকেই মেয়েদের আলাদা স্কুল গড়ে ওঠা এই অঞ্চলের শিক্ষাচেতনার একটি পরিচয় বহন করে।
লোকসংস্কৃতিতে গুনাইবিবির পালা, আসমান সিংহের পালা আর কৃষ্ণলীলার মতো পালাগান ছিল জনপ্রিয়। ভাটিয়ালি, সারিগান, মারফতি গান আর পল্লীগীতির সুর এখানকার নদী-খালে এখনো শোনা যায়। চারণকবি মুকুন্দ দাসের নামও এই অঞ্চলের লোকগানের ইতিহাসে স্মরণ করা হয়।
পিরোজপুরে ঘোরার জায়গা
বর্ষায় পিরোজপুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা বাজার। ঝালকাঠি আর বরিশালের সীমানা ঘেঁষা এই এলাকায় খালের ওপর নৌকা ভর্তি পেয়ারা কেনাবেচা হয়, আর বাগানের ভেতর দিয়ে ছোট নৌকায় ঘোরা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
মঠবাড়িয়ার শাপলেজা কুঠিবাড়ি ঔপনিবেশিক আমলের এক পুরোনো স্থাপনা, যাকে স্থানীয়রা নীলকুঠির সঙ্গে জড়িয়ে গল্প বলেন। রায়েরকাঠি জমিদারবাড়ি ও তার মন্দিরগুলো পুরোনো স্থাপত্যপ্রেমীদের ভালো লাগবে। শহরের কাছে বলেশ্বরের পাড় আর হরিণপালার রিভার ভিউ ইকোপার্কে বিকেল কাটানো যায়। আর স্বরূপকাঠির নার্সারিগুলো ঘুরে দেখা নিজেই এক অভিজ্ঞতা। নেছারাবাদের ছারছীনা দরবার শরিফও দক্ষিণাঞ্চলের পরিচিত ধর্মীয় কেন্দ্র, বিশেষ দিনগুলোতে সেখানে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন।
জেলা শহর থেকে বলেশ্বর ধরে দক্ষিণে নামলে নদী ক্রমশ চওড়া হয়, আর সাগরের কাছে গিয়ে এই নদীই সুন্দরবনের পূর্ব প্রান্ত ছুঁয়ে যায়। নৌকায় বা ট্রলারে এই পথে ভ্রমণ করলে বোঝা যায়, পিরোজপুরের মানুষ কেন নদীকে জীবনের কেন্দ্রে রাখেন।
পিরোজপুরের ঘরের খাবার
পিরোজপুরের খাবারের তালিকায় ফলই প্রথম। বর্ষায় পেয়ারা এখানে এত সহজলভ্য যে বাগানের পাশ দিয়ে হাঁটলেই তার গন্ধ পাওয়া যায়। কাঁচা পেয়ারা লবণ-মরিচ দিয়ে, পাকা পেয়ারা এমনিই, আর কোনো কোনো বাড়িতে পেয়ারার জেলি। আমড়া পিরোজপুরের আরেক প্রিয় ফল, টক-মিষ্টি আমড়ার আচার আর আমড়া দিয়ে রান্না করা ডাল অনেক বাড়ির নিয়মিত পদ।
নদীর জেলা বলে ইলিশ এখানকার রান্নাঘরে নিয়মিত অতিথি। কচা আর বলেশ্বরের ইলিশ ভাজা, সঙ্গে গরম ভাত আর ভাজার তেল, পিরোজপুরের মানুষের কাছে আরামের খাবার। বর্ষার দুপুরে নৌকা থেকে কেনা টাটকা মাছ, বাগানের ফল আর ঘরে রাঁধা ভাত, এই সরল আয়োজনেই পিরোজপুরের আতিথেয়তা। এসব খাবার আর কোথায় পাবেন জানতে দেখুন পিরোজপুরের বিখ্যাত খাবার।
যাতায়াত ও উপযুক্ত সময়
ঢাকা থেকে পিরোজপুরে সড়কপথে পদ্মা সেতু হয়ে সরাসরি বাস চলে। নদীপথও আছে: সদরঘাট থেকে লঞ্চে পিরোজপুর বা স্বরূপকাঠির দিকে যাওয়া যায়।
ভাসমান পেয়ারা বাজার দেখতে হলে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সবচেয়ে ভালো সময়। জমিদারবাড়ি আর নার্সারি ঘুরতে চাইলে শীতকালের শুকনো আবহাওয়া বেশি আরামদায়ক।
সাধারণ প্রশ্ন
পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজার কোথায়?
নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানা এলাকায় বর্ষায় খালের ওপর নৌকায় পেয়ারার হাট বসে।
স্বরূপকাঠি কেন বিখ্যাত?
নেছারাবাদ বা স্বরূপকাঠি সন্ধ্যা নদীর পাড়ের বিপুল নার্সারি, কাঠের হাট আর পেয়ারা বাগানের জন্য পরিচিত।
পিরোজপুর জেলা কবে গঠিত হয়?
বৃহত্তর বরিশালের মহকুমা পিরোজপুর ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh