Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

রংপুর জেলা: বিদ্রোহ, শিক্ষা আর হাঁড়িভাঙার দেশ

রংপুর বিভাগ · ৮টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. রঙ্গপুর, রংপুর না জঙ্গপুর
  2. কামরূপ থেকে কোম্পানি
  3. মুক্তিযুদ্ধের রংপুর
  4. তিস্তার পলি আর হাঁড়িভাঙার বাগান
  5. রোকেয়া, ভাওয়াইয়া আর রংপুরের মানুষ
  6. যেখানে ঘুরবেন
  7. হাঁড়িভাঙা, প্যালকা আর শিদলের স্বাদ
  8. ঢাকা থেকে রংপুর
  9. সাধারণ প্রশ্ন

১৭৮৩ সালে রংপুরের কৃষকেরা দল বেঁধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। ইজারাদার দেবী সিংহের অত্যাচার আর মাত্রাছাড়া খাজনার বিরুদ্ধে নূরলদীনের নেতৃত্বে সেই বিদ্রোহকে ইতিহাসবিদেরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার প্রথম বড় কৃষক অভ্যুত্থানগুলোর একটি বলে মনে করেন। প্রতিবাদের এই ধারা রংপুরে বারবার ফিরে এসেছে, আর একই মাটিতে জন্ম নিয়েছেন বেগম রোকেয়া, যিনি বাঙালি মুসলিম নারীর শিক্ষার জন্য আজীবন লড়েছেন। রংপুর জেলা তাই উত্তরবঙ্গের একটি বড় শহরই শুধু নয়, প্রতিরোধ আর জাগরণের এক দীর্ঘ ইতিহাসের কেন্দ্র।

রঙ্গপুর, রংপুর না জঙ্গপুর

রংপুর নামের উৎস নিয়ে কয়েকটি গল্প প্রচলিত আছে। একটি মতে, প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের রাজা ভগদত্তের প্রমোদকানন ছিল এখানে, যার নাম ছিল "রঙ্গপুর", পরে তা রংপুর হয়ে যায়। আরেক মতে, ইংরেজ আমলে এখানে প্রচুর নীল চাষ হতো, আর নীলকে স্থানীয়ভাবে "রং" বলা হতো, সেখান থেকেই নাম। প্রতিরোধ আন্দোলনের কেন্দ্র হওয়ায় অঞ্চলটিকে কেউ কেউ "জঙ্গপুর" বা যুদ্ধের শহর বলেও ডাকত বলে শোনা যায়। কোনো ব্যাখ্যাই নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।

কামরূপ থেকে কোম্পানি

প্রাচীনকালে অঞ্চলটি কামরূপ রাজ্যের অংশ ছিল, পরে কোচ রাজাদের প্রভাবে আসে, আর তারও পরে মুঘল শাসনের অধীনে যায়। ইংরেজ শাসনের একেবারে শুরুতেই রংপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে, আর বহু বছর ধরে বৃহত্তর রংপুর ছিল উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় জেলাগুলোর একটি।

অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে এই অঞ্চল ছিল ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অন্যতম ক্ষেত্র; ফকির মজনু শাহের নাম এখানকার লোকস্মৃতিতে আজও বেঁচে আছে। তার পরপরই ১৭৮৩ সালের নূরলদীনের বিদ্রোহ। বিদ্রোহ দমন করা হলেও এর জেরে কোম্পানিকে তদন্ত কমিশন বসাতে হয়েছিল, যা ইজারাদারি ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতা সামনে নিয়ে আসে।

শিক্ষার ইতিহাসেও রংপুর পুরোনো। রংপুর জিলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৩২ সালে, আর ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কারমাইকেল কলেজ উত্তরবঙ্গের উচ্চশিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর পুনর্গঠনের ধারায় বৃহত্তর রংপুর ভেঙে কয়েকটি জেলা হয়, আর ২০১০ সালে রংপুরকে কেন্দ্র করে আলাদা বিভাগ গঠিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের রংপুর

একাত্তরের মার্চেই রংপুরের রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে; সেই মাসেই শঙ্কু সমাজদার গুলিতে শহীদ হন, যাঁকে এ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদদের একজন হিসেবে স্মরণ করা হয়। ২৮ মার্চ মিঠাপুকুরসহ আশপাশের এলাকার হাজারো মানুষ লাঠি, তির-ধনুক আর বল্লম নিয়ে রংপুর সেনানিবাস ঘেরাও করতে যান; সেনাবাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ প্রাণ হারান। দিনটি রংপুরের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সাহসের দিন। এপ্রিলের শেষে কারমাইকেল কলেজের কয়েকজন শিক্ষককে ধরে নিয়ে দমদমা সেতুর কাছে হত্যা করা হয়। কাউনিয়া, বদরগঞ্জ আর পীরগঞ্জেও গণহত্যা চালানো হয়। কারমাইকেল কলেজ চত্বরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিভাস্কর্য সেই আত্মত্যাগের কথা মনে করায়।

তিস্তার পলি আর হাঁড়িভাঙার বাগান

রংপুরের উত্তর-পূর্ব দিক ঘেঁষে বয়ে গেছে তিস্তা, আর জেলার ভেতর দিয়ে ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, করতোয়া ও আখিরা। সমতল উর্বর জমিতে ধান, আলু, ভুট্টা আর তামাকের চাষ হয়, আর জেলার অর্থনীতির বড় ভিত্তি কৃষি। তবে গত দুই দশকে রংপুরের সবচেয়ে বড় কৃষি-পরিচয় হয়ে উঠেছে হাঁড়িভাঙা আম। মিঠাপুকুর অঞ্চলের বাগানগুলো থেকে আসা আঁশহীন, মিষ্টি এই আম এখন দেশজুড়ে পরিচিত।

রংপুরের হাতের কাজের সবচেয়ে বড় গৌরব শতরঞ্জি। মোটা সুতায় হাতে বোনা এই মেঝের গালিচার ঐতিহ্য বহু পুরোনো, আর বিশেষ করে নিসবেতগঞ্জ এলাকার তাঁতিরা এর জন্য পরিচিত। রংপুরের শতরঞ্জি এখন ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃত, বিদেশেও রপ্তানি হয়।

রোকেয়া, ভাওয়াইয়া আর রংপুরের মানুষ

১৮৮০ সালে মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দ গ্রামে জন্ম নেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। পর্দার আড়ালে আটকে থাকা সমাজে মেয়েদের শিক্ষার জন্য তিনি স্কুল খুলেছেন, লিখেছেন "সুলতানার স্বপ্ন"-র মতো সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা রচনা। পায়রাবন্দে তাঁর নামে স্মৃতিকেন্দ্র আছে, আর রংপুরের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টিও তাঁর নামে।

রংপুরের মানুষের মুখের ভাষা, যাকে অনেকে রংপুরি বা বাহে ভাষা বলেন, এখানকার সংস্কৃতির এক বড় অংশ। আর এই ভাষার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ ভাওয়াইয়া গানে। এর পাশাপাশি পালাগান, যোগীর গান, মুর্শিদি আর লালনের গানও এখানে গাওয়া হয়। গ্রামের মেলায় লোকনৃত্য, যাত্রা আর ভাওয়াইয়ার আসর জমে। রংপুরে সাঁওতাল, মুন্ডা ও ওরাওঁ জনগোষ্ঠীর মানুষেরও বাস, তাদের উৎসব আর নাচগান জেলার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে আলাদা রং যোগ করেছে।

যেখানে ঘুরবেন

শহরের কাছে তাজহাট রাজবাড়ি রংপুরের সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনা; বিশ শতকের গোড়ায় মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় এটি তৈরি করান। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে কয়েক বছর এখানে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি শাখা বসত, আর ১৯৯৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর একে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করে। সাদা মার্বেলের সিঁড়ি আর গম্বুজওয়ালা এই প্রাসাদে ২০০৫ সাল থেকে রংপুর জাদুঘর চলছে, যেখানে প্রাচীন পোড়ামাটির নিদর্শন আর পুরোনো পাণ্ডুলিপি দেখা যায়। পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র, শহরের কারমাইকেল কলেজের পুরোনো ভবন, তিন গম্বুজের কেরামতিয়া মসজিদ আর পীরগাছা জমিদারবাড়িও ঘুরে দেখার মতো।

হাঁড়িভাঙা, প্যালকা আর শিদলের স্বাদ

রংপুরের খাবারের তালিকায় প্রথমেই আসে হাঁড়িভাঙা আম। জুনের মাঝামাঝি থেকে বাজারে আসা এই আম তার মসৃণ শাঁস আর হালকা মিষ্টতার জন্য এখন দেশজুড়ে চাহিদায়। গ্রীষ্মের সেই কয়েক সপ্তাহ রংপুরের হাটগুলো আমের ঝুড়িতে ভরে থাকে।

তবে রংপুরের নিজস্ব রান্নার আসল পরিচয় পাওয়া যায় গ্রামের রান্নাঘরে। নানা শাক আর খাবার সোডা দিয়ে রান্না করা ঘন, স্যুপের মতো প্যালকা এ অঞ্চলের বিশেষ খাবার। ছোট মাছ শুকিয়ে কচুর সঙ্গে বেটে, মণ্ড বানিয়ে রোদে শুকিয়ে তৈরি হয় শিদল, যা পরে রান্না করে খাওয়া হয়; এসব ঐতিহ্যবাহী খাবার আজকাল অবশ্য কমে আসছে। তিস্তা ও ঘাঘটের মাছের ঝোল আর শীতে নতুন চালের ভাপা ও চিতই পিঠা রংপুরের ঘরে ঘরে চেনা স্বাদ। আরও খাবারের খোঁজ মিলবে রংপুরের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

ঢাকা থেকে রংপুর

ঢাকা থেকে সড়কপথে যমুনা সেতু হয়ে বাসে রংপুর যাওয়া সবচেয়ে প্রচলিত। রেলপথে সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চলে, আর আকাশপথে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নেমে সড়কপথে অল্প সময়েই রংপুর পৌঁছানো যায়। ঐতিহাসিক স্থান ঘোরার জন্য শীতকাল আরামদায়ক, আর হাঁড়িভাঙা আমের স্বাদ নিতে চাইলে জুনের শেষ থেকে জুলাইয়ের শুরু সবচেয়ে ভালো সময়।

সাধারণ প্রশ্ন

বেগম রোকেয়া কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?

বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানে তাঁর নামে একটি স্মৃতিকেন্দ্র আছে।

হাঁড়িভাঙা আম কোথায় পাওয়া যায়?

হাঁড়িভাঙা আম মূলত রংপুরের মিঠাপুকুর ও আশপাশের অঞ্চলে চাষ হয়। জুনের মাঝামাঝি থেকে এই আম বাজারে আসে।

তাজহাট রাজবাড়িতে কী আছে?

তাজহাট রাজবাড়িতে ২০০৫ সাল থেকে রংপুর জাদুঘর রয়েছে। সেখানে প্রাচীন পোড়ামাটির নিদর্শন, মুদ্রা ও পুরোনো পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

রংপুরের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ রংপুরের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 রংপুর বিভাগের অন্য জেলা