সুনামগঞ্জ জেলা: হাওর আর গানের রাজ্য
সিলেট বিভাগ · ১১টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
ঘরবাড়ির অসারতা নিয়ে হাসন রাজার গান শোনেননি এমন বাঙালি কম। সেই গানের জন্ম যে মাটিতে, সেই সুনামগঞ্জ জেলায় গেলে বোঝা যায়, এখানকার গান কেন এত উদাস আর গভীর। বর্ষায় চারদিকে শুধু পানি, তার মাঝে ভেসে থাকা গ্রাম, দূরে মেঘালয়ের নীল পাহাড়। সিলেট বিভাগের উত্তর-পশ্চিমের এই জেলা দেশের হাওরাঞ্চলের হৃদয়, আর হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত ও শাহ আবদুল করিমের মতো মরমি সাধকদের জন্মভূমি।
সুনামউদ্দির গঞ্জ
নামটির পেছনে একজন সৈনিকের গল্প। প্রচলিত আছে, মোগল আমলে সুনামউদ্দি নামে এক সৈনিক যুদ্ধে সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে সম্রাটের কাছ থেকে এখানে জমি পান। সেই জমিতে গড়ে ওঠা বাজার বা গঞ্জের নাম হয় তাঁর নামে, আর সেখান থেকে সুনামগঞ্জ। তার আগে এলাকাটি বনগাঁও নামে পরিচিত ছিল বলেও শোনা যায়।
হাওরের ভূগোল, পানির জীবন
সুনামগঞ্জের মানচিত্রের বড় অংশ জুড়ে হাওর। শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর, দেখার হাওর আর সবচেয়ে বিখ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওর—এগুলো শুকনো মৌসুমে বিস্তীর্ণ ধানখেত, আর বর্ষায় দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওর ২০০০ সালে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে রামসার তালিকায় স্থান পায়। হিজল-করচের সারি, অসংখ্য প্রজাতির মাছ আর শীতে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি এর সম্পদ।
সুরমা নদী জেলা শহরের গা ঘেঁষে বয়ে গেছে। উত্তরে মেঘালয় থেকে নেমে আসা যাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ পানি আর বালুচর, কুশিয়ারা ও আরও অসংখ্য নদী-খাল মিলে জেলাটি পানির জালে বোনা। হাওরের মানুষের জীবিকা মূলত বোরো ধান আর মাছ। বছরে একটিমাত্র ফসল, তাই আগাম বন্যা বা পাহাড়ি ঢল সেই ফসল ডুবিয়ে দিলে পুরো বছরের হিসাব উল্টে যায়। উত্তরের সীমান্ত এলাকায় পাথর ও বালু উত্তোলন, আর ছাতকে সিমেন্ট শিল্পও জীবিকার উৎস।
বর্ষায় হাওরের গ্রামগুলোর চেহারা বদলে যায়। উঁচু ভিটার ওপর গাদাগাদি ঘর, চারপাশে থইথই পানি, আর ঢেউয়ের আঘাত থেকে ভিটা বাঁচাতে বাঁশের বেড়া। হাটে যেতে, স্কুলে যেতে, এমনকি পাশের বাড়িতে যেতেও নৌকা লাগে। স্থানীয়ভাবে এই সময়টাকে অনেকে অবসরের কাল বলেন; মাঠে কাজ নেই, তাই রাতে বসে গানের আসর, কিসসা আর পালা। হাওরের গানের যে বিশাল ভাণ্ডার, তার অনেকটাই জন্মেছে এই অবসরের রাতগুলোতে।
লাউড় থেকে মহকুমা
প্রাচীনকালে এ অঞ্চল কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষপুর রাজ্যের অংশ ছিল বলে ধারণা করা হয়। পরে লাউড় রাজ্যের অধীনে আসে; তাহিরপুর অঞ্চলে লাউড়ের রাজধানীর স্মৃতি এখনো আলোচিত হয়। এরপর মোগল ও ব্রিটিশ শাসন। ব্রিটিশ আমলে সুনামগঞ্জ সিলেট জেলার একটি মহকুমা হয়, আর ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ ছিল ৫ নম্বর সেক্টরের আওতায়। এপ্রিলের শেষে ছাতকে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আগস্টের শেষ দিনে জগন্নাথপুরের শ্রীরামসীতে পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকারদের সহায়তায় গ্রামবাসীদের জড়ো করে গণহত্যা চালায় এবং গ্রামে আগুন দেয়। ৭ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়।
মরমি গানের তীর্থ
সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় সম্পদ সম্ভবত এর গান। উনিশ শতকের জমিদার হাসন রাজা জীবনের এক পর্যায়ে বিষয়-আশয় থেকে মুখ ফিরিয়ে মরমি গান লিখতে শুরু করেন; তাঁর গানে নশ্বর জীবন আর স্রষ্টার প্রতি আকুতি মিশে আছে। শহরে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি আর জাদুঘর আছে। জগন্নাথপুরের রাধারমণ দত্ত ধামাইল গানের জন্য স্মরণীয়; বিয়ের আসরে মেয়েরা গোল হয়ে হাততালি দিয়ে যে ধামাইল নাচ-গান করেন, তাঁর লেখা গান তার প্রাণ। আর দিরাইয়ের শাহ আবদুল করিম, যাঁকে মানুষ বাউল সম্রাট বলে ডাকে, কালনী নদীর তীরের গ্রাম থেকে গান লিখে পৌঁছে গেছেন দেশের প্রতিটি কোণে।
গানের পাশাপাশি হাওরে নৌকাবাইচ, হালযাত্রা উৎসব আর নানা ব্রত ও লোকাচার এখনো টিকে আছে। শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুর পর দিরাইয়ে তাঁর বাড়ি আর সমাধিতে ভক্তরা নিয়মিত যান, আর তাঁর স্মরণে গানের আসর বসে। হাসন রাজার গান নিয়ে প্রতিবছর বিভিন্ন উৎসবও হয়। মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর জন্মও সুনামগঞ্জে।
ঘুরে দেখার জায়গা
তাহিরপুর উপজেলাই সুনামগঞ্জ ভ্রমণের কেন্দ্র। টাঙ্গুয়ার হাওরে নৌকায় এক রাত কাটানো এখন অনেক ভ্রমণপ্রেমীর তালিকায়; ওয়াচটাওয়ারের কাছে হিজল বনের মাঝে স্বচ্ছ পানিতে নামা যায়। কাছেই শহীদ সিরাজ লেক, যার নীল-সবুজ পানির চারপাশে টিলা; টেকেরঘাটের পুরোনো চুনাপাথরের খনি এলাকা; আর যাদুকাটা নদীর তীরে বিস্তৃত শিমুল বাগান, যা বসন্তে লাল ফুলে ঢেকে যায়। যাদুকাটার পাশে বারিক টিলা থেকে নদী আর মেঘালয়ের পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যায়। শহরে হাসন রাজার বাড়ি ও জাদুঘরে কিছুটা সময় কাটানো যায়; সেখানে তাঁর ব্যবহৃত নানা জিনিস সংরক্ষিত আছে। সুরমার তীরে বিকেলে নৌকার আনাগোনা দেখতেও ভালো লাগে।
হাওরের পাতে কী থাকে
হাওরের রান্নাঘর মাছ ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। বর্ষায় জাল ফেললেই উঠে আসে বোয়াল, রুই, আইড়, কই, শিং আর অসংখ্য ছোট মাছ, যা দিয়ে রাঁধা হয় পাতলা মাছের ঝোল। শুকনো মৌসুমে সেই মাছ মাচায় শুকিয়ে বানানো হয় শুঁটকি; হাওরের শুঁটকি দিয়ে ঝাল ভর্তা আর ভুনা সারা বছর চলে, আর তা জেলার বাইরেও যায়।
হাওরে হাঁস পালন বহু পরিবারের আয়ের উৎস। খোলা পানিতে চরে বেড়ানো এই হাঁসের মাংস শীতে চালের রুটি বা ভাতের সঙ্গে ঝাল করে রাঁধা হয়, যা অতিথি আপ্যায়নের প্রিয় পদ। আরও জানতে দেখুন সুনামগঞ্জের বিখ্যাত খাবার।
শীতে হাওরের পানি নেমে গেলে শুরু হয় বিল সেচে মাছ ধরার মৌসুম, যা গ্রামে এক রকম উৎসবের মতো। সেই সময় তাজা মাছ দিয়ে রাঁধা ঝোল, মাছ ভাজা আর ভর্তা দিয়ে দুপুরের খাবার হাওরের মানুষের কাছে বছরের সবচেয়ে আনন্দের ভোজগুলোর একটি। নৌকায় টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের জন্যও মাঝিরা অনেক সময় নৌকাতেই হাওরের মাছ আর হাঁসের মাংস রেঁধে দেন।
যাতায়াত ও সময়
ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জে সাধারণত সড়কপথে বাসে যাওয়া হয়, সিলেট হয়ে। অনেকে ট্রেনে বা বিমানে সিলেট পৌঁছে সেখান থেকে সড়কপথে সুনামগঞ্জ যান। জেলার ভেতরে হাওরে ঘোরার প্রধান বাহন নৌকা। টাঙ্গুয়ার হাওরের আসল রূপ দেখতে বর্ষা সবচেয়ে ভালো, আর পরিযায়ী পাখি দেখতে শীত।
সাধারণ প্রশ্ন
সুনামগঞ্জ নাম কীভাবে হলো?
প্রচলিত আছে, মোগল আমলে সুনামউদ্দি নামে এক সৈনিক সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে এখানে জমি পান। সেই জমিতে গড়ে ওঠা গঞ্জ থেকে নাম হয় সুনামগঞ্জ।
টাঙ্গুয়ার হাওর কেন বিখ্যাত?
টাঙ্গুয়ার হাওর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিঠাপানির জলাভূমি, যা ২০০০ সালে রামসার তালিকায় স্থান পায়। হিজল-করচের বন, মাছ আর শীতের পরিযায়ী পাখির জন্য এটি বিখ্যাত।
সুনামগঞ্জের বিখ্যাত শিল্পী কারা?
মরমি কবি হাসন রাজা, ধামাইল গানের রাধারমণ দত্ত এবং বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম সুনামগঞ্জের মানুষ।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh