টাঙ্গাইল জেলা: তাঁত, চমচম আর শালবনের জনপদ
ঢাকা বিভাগ · ১২টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
দেলদুয়ারের পাথরাইল গ্রামে ঢুকলে প্রথমে কানে আসে একটা ছন্দময় শব্দ — মাকুর আসা-যাওয়া, তাঁতের কাঠের খটখট। ঘরের বারান্দায় রঙিন সুতার গুটি শুকাচ্ছে, উঠানে কেউ টানা দিচ্ছেন। এই শব্দের মধ্যেই বোনা হয় টাঙ্গাইল শাড়ি, যার নাম দেশের সীমানা পেরিয়ে বহু দূর গেছে। কিন্তু টাঙ্গাইল জেলা শুধু শাড়ির জেলা নয়; এখানে আছে মোগল আমলের মসজিদ, মধুপুরের লাল মাটির শালবন, যমুনার বিস্তীর্ণ চর আর পোড়াবাড়ির চমচম। ঢাকা বিভাগের এই বড় জেলায় বারোটি উপজেলা — টাঙ্গাইল সদর, মির্জাপুর, মধুপুর, ঘাটাইল, কালিহাতি, ভূঞাপুর, গোপালপুর, বাসাইল, সখিপুর, নাগরপুর, দেলদুয়ার আর ধনবাড়ী।
টাঙ্গাইল নামের নানা গল্প
টাঙ্গাইল নামের উৎস নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে, আর প্রতিটিই এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি বা মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়ানো। একটি মতে, উঁচু ঢালু জমিকে স্থানীয়ভাবে "টান" বলা হয়, আর জমির সীমানা হলো "আইল" — এই দুই শব্দ মিলে টাঙ্গাইল। আরেকটি বহুল প্রচলিত গল্প বলে, ব্রিটিশ আমলে এক নীলকরের তৈরি উঁচু পথ বা আইল থেকে নামটি এসেছে। কেউ কেউ আবার ঘোড়ায় টানা টাঙ্গাগাড়ির চালকদের বসতির কথা বলেন।
গল্প যা-ই হোক, ঐতিহাসিকভাবে উনিশ শতকের মাঝামাঝির আগে "টাঙ্গাইল" নামের আলাদা পরিচয় তেমন পাওয়া যায় না। এ অঞ্চল তখন আটিয়া পরগনা নামে পরিচিত ছিল। ১৮৭০ সালে মহকুমার সদর দপ্তর আটিয়া থেকে টাঙ্গাইলে সরিয়ে আনা হলে নতুন নামটিই প্রধান হয়ে ওঠে।
আটিয়া থেকে স্বতন্ত্র জেলা
মোগল আমলে আটিয়া পরগনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। এখানকার শাসক সাঈদ খান পন্নীর সময়ে নির্মিত আটিয়া মসজিদ, শিলালিপি অনুযায়ী ১৬০৯ সালের দিকের, আজও তার পোড়ামাটির অলংকরণ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পন্নী বংশ পরে করটিয়ার জমিদার হিসেবে পরিচিত হয়।
ব্রিটিশ আমলে টাঙ্গাইল ছিল ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা। আলাদা জেলার দাবি উঠেছিল অনেক আগেই — দেশভাগের পরপরই এ নিয়ে আন্দোলন হয়। অবশেষে ১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
একাত্তরে টাঙ্গাইল
মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয় কাদেরিয়া বাহিনীর জন্য। আবদুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই বাহিনীতে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, এবং তাঁরা জেলার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সফল অভিযান চালান। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ ভূঞাপুর কলেজের শহীদ মিনারে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ানো হয়। এপ্রিলে কালিহাতিতে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে বড় লড়াই হয়। ডিসেম্বরে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে, আর ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল শহর শত্রুমুক্ত হয়। প্রতি বছর এই দিনটি টাঙ্গাইল মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়।
যমুনা থেকে মধুপুর গড়
টাঙ্গাইলের ভূপ্রকৃতি দুই রকম। পশ্চিমে যমুনা — বিশাল, চঞ্চল, চরে ভরা। এই নদীর ওপর দিয়েই গেছে বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতু, যার পূর্ব প্রান্ত ভূঞাপুর-কালিহাতির কাছে। জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ধলেশ্বরী, লৌহজং, বংশী আর ঝিনাই।
উত্তর-পূর্বে মাটির রং বদলে যায়। মধুপুর গড়ের লালচে উঁচু মাটিতে ছড়িয়ে আছে শালবন, যার একটি অংশ এখন মধুপুর জাতীয় উদ্যান। এই বনাঞ্চলে বহু প্রজন্ম ধরে গারো সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন, তাঁদের নিজস্ব ভাষা, উৎসব আর জীবনধারা নিয়ে। মধুপুরের লাল মাটিতে আনারস, কলা, কাঁঠাল আর নানা সবজির চাষ হয়; আনারসের মৌসুমে হাটগুলো হলুদ-সবুজ ফলে ভরে যায়।
জেলার সমতল অংশে ধান আর পাট প্রধান ফসল, আর বহু পরিবারের জীবিকা তাঁত, কাঁসা-পিতল আর মৃৎশিল্পের মতো কারুশিল্পে।
তাঁতি, কাঁসারি আর গুণী মানুষ
টাঙ্গাইল শাড়ির পেছনে আছে বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিদের দীর্ঘ ঐতিহ্য। পাথরাইল, বাজিতপুর আর আশপাশের গ্রামে সুতি, হাফসিল্ক আর জামদানি ধাঁচের শাড়ি বোনা হয়। ২০২৪ সালে টাঙ্গাইল শাড়ি দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পায়। কাগমারী অঞ্চলের কাঁসা-পিতলের বাসন তৈরির কারিগরিও পুরোনো ঐতিহ্য।
লোকসংস্কৃতিতে ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, জারি, সারি, কবিগান আর বাউল গানের ধারা জীবন্ত। নবান্ন আর পৌষসংক্রান্তির উৎসব, লাঠিখেলা আর নৌকাবাইচ গ্রামীণ জীবনের অংশ।
টাঙ্গাইলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাম; সন্তোষে তাঁর সমাধি, আর সেখানেই তাঁর নামে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এবং ভাষা আন্দোলন-পর্বের রাজনীতিক শামছুল হক এ জেলার সন্তান। মির্জাপুরে রণদা প্রসাদ সাহার প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী হাসপাতাল ও ভারতেশ্বরী হোমস জেলার শিক্ষা ও সেবার ইতিহাসে বিশেষ জায়গা নিয়ে আছে।
ঘুরে দেখার তালিকা
টাঙ্গাইলে দেখার জায়গার অভাব নেই। দেলদুয়ারের আটিয়া মসজিদ মোগল স্থাপত্যের সূক্ষ্ম কাজ দেখার জন্য প্রথমে যাওয়া উচিত। মির্জাপুরের মহেড়া জমিদার বাড়ি তার রঙিন অট্টালিকা আর সবুজ চত্বরের জন্য জনপ্রিয়। মধুপুর জাতীয় উদ্যানের শালবনে হাঁটা এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। গোপালপুরের হেমনগরের জমিদার বাড়ি, যা পরীর দালান নামেও পরিচিত, পুরোনো কারুকাজের জন্য দেখার মতো। আর যমুনা সেতুর পাশে দাঁড়িয়ে বিকেলে নদী দেখা অনেক ভ্রমণকারীর প্রিয় সমাপ্তি।
চমচমের শহরে
টাঙ্গাইলের নাম শুনলে বাংলাদেশের প্রায় সবার জিভে একটা স্বাদ ভেসে আসে — পোড়াবাড়ির চমচম। টাঙ্গাইল সদরের পোড়াবাড়ি নামের জায়গাটি থেকে এই মিষ্টির খ্যাতি ছড়িয়েছে, আর তার ইতিহাস উনিশ শতক পর্যন্ত পৌঁছায় বলে ধরা হয়। লালচে-বাদামি রঙের লম্বাটে চমচম, ভেতরে ঘন রসালো ছানা, বাইরে হালকা মাওয়ার আস্তরণ — কামড় দিলে ভেতরটা দানাদার মনে হয়। ২০২৪ সালের শুরুতে পোড়াবাড়ির চমচম ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। শহরের পাঁচআনি বাজারের মিষ্টির দোকানগুলোতে দিনভর ভিড় লেগে থাকে।
চমচমের পাশাপাশি টাঙ্গাইলের মিষ্টি দইয়েরও কদর আছে। মাটির হাঁড়িতে জমানো ঘন দই বিয়ে-শাদি বা অতিথি আপ্যায়নে প্রায় অপরিহার্য। আর যমুনা-ধলেশ্বরী-বংশীর জেলা বলে মাছের ঝোল প্রতিদিনের ভাতের সঙ্গী — যমুনার বোয়াল, আইড় কিংবা চরের বিলের ছোট মাছ, আলু-বেগুনে রান্না। মধুপুর অঞ্চলে আনারসের মৌসুমে তাজা আনারস আর কাঁঠালও খাবারের তালিকায় যোগ হয়। জেলার আরও খাবারের পরিচয় পাবেন টাঙ্গাইলের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাতায়াত ও সেরা মৌসুম
ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল সড়কপথে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে যাওয়া যায়; উত্তরবঙ্গগামী বহু বাস জেলার ওপর দিয়ে যায়। রেলপথেও ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল স্টেশনে যাওয়া যায়। শীতকাল ঘোরার জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক, তখন মধুপুরের বনে হাঁটা আর তাঁতপল্লিতে ঘোরা সহজ। আনারস খেতে চাইলে বর্ষার শুরু, আর চমচম সারা বছরই পাওয়া যায়।
সাধারণ প্রশ্ন
টাঙ্গাইল জেলা কবে গঠিত হয়?
টাঙ্গাইল ১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলা থেকে আলাদা হয়ে স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
পোড়াবাড়ির চমচম কোথায় পাওয়া যায়?
পোড়াবাড়ির চমচম টাঙ্গাইল সদরের পোড়াবাড়ি এলাকা থেকে খ্যাতি পেয়েছে, আর টাঙ্গাইল শহরের পাঁচআনি বাজারসহ বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে এটি পাওয়া যায়।
টাঙ্গাইল শাড়ি কোথায় তৈরি হয়?
টাঙ্গাইল শাড়ি মূলত দেলদুয়ারের পাথরাইলসহ আশপাশের তাঁতপল্লিতে বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিদের হাতে বোনা হয়।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh