Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

ঠাকুরগাঁও জেলা: আমবাগান, গমের মাঠ আর পুরোনো রাজবাড়ির দেশ

রংপুর বিভাগ · ৫টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. ঠাকুরবাড়ি থেকে ঠাকুরগাঁও
  2. পুণ্ড্র-বরেন্দ্র থেকে মহকুমা
  3. একাত্তরের দিনগুলো
  4. গমের ভান্ডার, আমের বাগান
  5. মানুষ, মেলা আর লোকগান
  6. ঠাকুরগাঁওয়ে কোথায় যাবেন
  7. আম, লিচু আর শীতের পিঠা
  8. যাত্রাপথ ও উপযুক্ত সময়
  9. সাধারণ প্রশ্ন

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা মণ্ডুমালা গ্রামে একটি আমগাছ আছে, যাকে দূর থেকে দেখলে বটগাছ বলে ভুল হয়। ডালপালা মাটিতে নুয়ে পড়ে আবার ওপরে উঠেছে, ছড়িয়ে আছে কয়েক বিঘা জমি জুড়ে। স্থানীয় হিসাবে গাছটির বয়স দুশো বছরেরও বেশি, আর এটি সূর্যপুরী জাতের আম দেয়। ঠাকুরগাঁও জেলা এমনই এক জায়গা, যেখানে মাটির উর্বরতা চোখে দেখা যায়: শীতে সবুজ গমের মাঠ, গ্রীষ্মে আমের বাগান, আর মাঝখানে টাঙ্গন, কুলিক আর নাগর নদীর শান্ত ধারা। এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে মধ্যযুগের পীর-দরবেশ, নাথ যোগী আর জমিদারদের গল্প।

ঠাকুরবাড়ি থেকে ঠাকুরগাঁও

নামের গল্পটা বেশ সরল। প্রচলিত আছে, এখানে নারায়ণ চক্রবর্তী ও সতীশ চক্রবর্তী নামে দুই ভাইয়ের পরিবার বাস করতেন, যাঁদের বাড়ি "ঠাকুরবাড়ি" নামে পরিচিত ছিল। লোকমুখে সেই ঠাকুরবাড়ির নাম থেকেই এলাকার নাম হয় ঠাকুরগাঁও। কোচবিহারের পুরোনো এক মানচিত্রের সূত্রে কেউ কেউ বলেন, জায়গাটির আগের নাম ছিল নিশ্চিন্তপুর। দুটি ব্যাখ্যাই লোকশ্রুতি ও স্থানীয় ইতিহাসনির্ভর।

পুণ্ড্র-বরেন্দ্র থেকে মহকুমা

ঠাকুরগাঁও প্রাচীন পুণ্ড্র-বরেন্দ্র অঞ্চলের অংশ। পুকুর খনন বা চাষাবাদের সময় এখানকার মাটি থেকে বহুবার প্রাচীন বৌদ্ধ ও হিন্দু মূর্তি উঠে এসেছে। নাথ সম্প্রদায়ের গুরু গোরক্ষনাথের সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগের কথাও স্থানীয় ইতিহাসে বলা হয়, যদিও এর পাকা প্রমাণ নেই। মধ্যযুগে গৌড়ের সুলতানি শাসন আর পরে মুঘল প্রশাসনের আওতায় আসে অঞ্চলটি।

ইংরেজ আমলে এটি ছিল দিনাজপুর জেলার অংশ। এখানে প্রথমে থানা স্থাপিত হয়, পরে ১৮৬০ সালে ঠাকুরগাঁও মহকুমা গঠিত হয়। ১৯৮৪ সালে ঠাকুরগাঁও পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।

একাত্তরের দিনগুলো

মুক্তিযুদ্ধের সময় এপ্রিলের মাঝামাঝি পাকিস্তানি বাহিনী ঠাকুরগাঁওয়ে ঢুকে পড়ে। পীরগঞ্জের ভাতারমারী ফার্মের কাছে রাস্তার ধারে বহু বাঙালিকে হত্যা করা হয়। এপ্রিলের শেষে তীরনই নদীর পাড়ে কুশলডাঙ্গী হাটের কাছে এবং বালিয়াডাঙ্গীর নানা জায়গায় নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। হরিপুরেও লুটপাট, অগ্নিসংযোগ আর হত্যাযজ্ঞ চলে। অন্যদিকে সদর উপজেলার ভুল্লী, গড়েয়া ও সালন্দরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। জেলায় একাধিক গণকবর ও বধ্যভূমি চিহ্নিত হয়েছে।

গমের ভান্ডার, আমের বাগান

ঠাকুরগাঁওয়ের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে টাঙ্গন, কুলিক, নাগর, পুনর্ভবা আর তীরনই নদী। হিমালয়ের পাদদেশের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে শীত বেশ কড়া, আর সেই ঠান্ডা আবহাওয়ায় গমের ফলন খুব ভালো হয়। জেলাটি দেশের অন্যতম প্রধান গম উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত। ধান, আলু, ভুট্টা, পাট আর আখও এখানে প্রচুর হয়, আর জেলার বিপুল সংখ্যক মানুষ সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আখ থেকে চিনি তৈরির জন্য জেলায় একটি সরকারি চিনিকলও আছে।

ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ঠাকুরগাঁওয়ের সকাল প্রায়ই ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকে, কোনো কোনো দিন দুপুরের আগে সূর্যের মুখ দেখা যায় না। এই ঠান্ডাতেই মাঠজুড়ে গমের চারা সবুজ হয়ে ওঠে, আর ফাল্গুন-চৈত্রে সেই মাঠ সোনালি রং নেয়। গ্রামের মানুষ খড়ের আগুন জ্বেলে উঠানে বসে শীত তাড়ান, যা উত্তরের এই জেলার শীতকালীন চেনা ছবি।

গত কয়েক দশকে আম আর লিচুর বাগান ঠাকুরগাঁওয়ের অর্থনীতির নতুন ভিত্তি হয়ে উঠেছে। বালিয়াডাঙ্গী আর হরিপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় সূর্যপুরী আমের নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায়।

মানুষ, মেলা আর লোকগান

ঠাকুরগাঁওয়ে মুসলমান ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুন্ডা ও রাজবংশী মানুষের বাস। এই বৈচিত্র্যই এখানকার উৎসব আর মেলাকে রঙিন করেছে। চৈত্রের চড়ক পূজা, কার্তিকের রাসযাত্রা আর বিভিন্ন জায়গার কালী মেলা জেলার পরিচিত উৎসব।

সবচেয়ে বিখ্যাত অবশ্য নেকমরদের মেলা। রাণীশংকৈল সদর থেকে কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে নেকমরদ গ্রামে শায়িত আছেন পীর সৈয়দ নাসিরুদ্দীন শাহ, যিনি সম্ভবত দ্বাদশ শতকের শেষ বা ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে এ অঞ্চলে আসেন। তাঁর সততা আর ধার্মিকতায় মুগ্ধ মানুষ তাঁকে "নেকমরদ" বা পুণ্যবান মানুষ বলে ডাকত, আর তাঁর আস্তানার গ্রামটির নামও বদলে হয় নেকমরদ। প্রতিবছর তাঁর ওরস উপলক্ষে এখানে বড় মেলা বসে, যেখানে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে।

নেকমরদ এলাকাটি নিজেও প্রত্নতত্ত্বের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের চারপাশে বেশ বড় একটি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন বড় বড় পুকুর আর নানা পুরোনো নিদর্শন, যা থেকে বোঝা যায় পীরের আগমনের আগেও এখানে জনবসতি ছিল। কাছেই গোরক্ষনাথ মন্দির চত্বর, যেখানে পাথরের কূপ আর শিলালিপি নাথ যোগীদের স্মৃতি বহন করে। ফলে একই এলাকায় সুফি দরবেশ আর নাথ যোগী, দুই ভিন্ন ধর্মীয় ধারার ছাপ পাশাপাশি দেখা যায়, যা ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাসের মিশ্র চরিত্রটিকে স্পষ্ট করে।

লোকগানের দিক থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে ভাওয়াইয়া, জারি, সারি, কবিগান আর সত্যপীরের পালাগানের চর্চা আছে।

ঠাকুরগাঁওয়ে কোথায় যাবেন

বালিয়াডাঙ্গীর মণ্ডুমালায় পুরোনো সূর্যপুরী আমগাছটি দেখতে এখন প্রায় সারা বছরই মানুষ যায়। রাণীশংকৈলের নেকমরদের কাছে আছে গোরক্ষনাথ মন্দির, একটি প্রাচীন পাথরের কূপ আর শিলালিপি। একই উপজেলায় রাজা টংকনাথের রাজবাড়ির ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ আর রামরাই দিঘি ইতিহাসের স্বাদ দেয়। হরিপুর রাজবাড়ি আর সদরের জামালপুর জামে মসজিদ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকা উল্লেখযোগ্য স্থাপনা। প্রকৃতি ভালোবাসলে পীরগঞ্জের শালবন আর টাঙ্গন নদীর তীর বিকেলের জন্য ভালো জায়গা।

আম, লিচু আর শীতের পিঠা

ঠাকুরগাঁওয়ের খাবারের মৌসুমি ক্যালেন্ডার খুব স্পষ্ট। মে-জুনে আসে লিচু, আর তার পরপরই আম। সূর্যপুরী আমের আকার মাঝারি, খোসা পাতলা, আর ঘ্রাণ চমৎকার; স্থানীয়দের দাবি, এর স্বাদ উত্তরের অন্য জাতগুলোর চেয়ে আলাদা। বাগান থেকে সরাসরি কিনে আনা টাটকা আম এখানে গ্রীষ্মের অন্যতম আনন্দ।

শীত নামলে ঠাকুরগাঁওয়ের রান্নাঘর পিঠার গন্ধে ভরে ওঠে। নতুন চালের গুঁড়ায় তৈরি ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা আর দুধ-চিতই কুয়াশাঢাকা সকালে খেজুর গুড়ের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। সীমান্ত এলাকার হাটে শীতের বিকেলে গরম পিঠার দোকান বসে। এ জেলার আরও খাবারের খোঁজ পাবেন ঠাকুরগাঁওয়ের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাত্রাপথ ও উপযুক্ত সময়

ঢাকা থেকে সড়কপথে বাসে সরাসরি ঠাকুরগাঁও যাওয়া যায়। পঞ্চগড়গামী আন্তঃনগর ট্রেন ঠাকুরগাঁও হয়ে যায়, তাই রেলপথেও যাতায়াত সম্ভব। আকাশপথে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নেমে সড়কপথে আসাও প্রচলিত। আম-লিচুর স্বাদ নিতে চাইলে মে থেকে জুলাই, আর মেলা, পিঠা ও ঐতিহাসিক স্থান ঘোরার জন্য শীতকাল সবচেয়ে ভালো। শহর থেকে উপজেলাগুলোর ঐতিহাসিক জায়গায় যেতে স্থানীয় বাস, অটোরিকশা বা ভাড়া করা গাড়ি সহজেই পাওয়া যায়।

সাধারণ প্রশ্ন

ঠাকুরগাঁও নামের উৎপত্তি কী?

প্রচলিত আছে, নারায়ণ ও সতীশ চক্রবর্তীর পরিবারের "ঠাকুরবাড়ি" থেকে এলাকার নাম হয় ঠাকুরগাঁও। জায়গাটির পুরোনো নাম নিশ্চিন্তপুর ছিল বলেও মত আছে।

সূর্যপুরী আমের পুরোনো গাছটি কোথায়?

গাছটি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার হরিণমারী সীমান্তের কাছে মণ্ডুমালা গ্রামে। স্থানীয় হিসাবে এর বয়স দুশো বছরেরও বেশি।

নেকমরদ কোথায় এবং কেন বিখ্যাত?

নেকমরদ ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায়, পীর সৈয়দ নাসিরুদ্দীন শাহের মাজারের জন্য বিখ্যাত। তাঁর ওরস উপলক্ষে প্রতিবছর এখানে বড় মেলা বসে।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

ঠাকুরগাঁওর খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ ঠাকুরগাঁওর খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 রংপুর বিভাগের অন্য জেলা